বাংলাদেশে সংবিধান নিয়ে শুধু আদালত, সংসদ কিংবা আইনজীবী-বিচারকদের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নেই; সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর চর্চা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি চায়ের দোকানেও সংবিধান নিয়ে আলোচনা হয়। এ ধরনের আলোচনা নাগরিকদের নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের আয়োজনে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে আইনজীবী বা বিচারকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে এবং নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব কী—এসব বিষয়ে যত বেশি মতবিনিময় হবে, সাংবিধানিক সচেতনতাও তত বাড়বে।
সংবিধান নিয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিন্ন মত ও চিন্তার মানুষের আলোচনা এবং বিতর্কের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক চর্চা বিকশিত হয়। সাধারণ মানুষের সংবিধানবিষয়ক আগ্রহকে ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, মৌলিক অধিকার রক্ষায় উচ্চ আদালতের এখতিয়ার বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কিছু ক্ষেত্রে এ সাংবিধানিক ব্যবস্থার অপব্যবহার বা ভুল প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধান ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়, আমাদের লক্ষ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা।’
এসব অপরাধের বিচারের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত আসতে হবে এবং যে কোনো মামলায় অপরাধ প্রমাণের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অতীতের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, রাজনৈতিক হয়রানি ও মামলা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও সংখ্যা তুলে ধরেন। এসব তথ্য তাঁর বক্তব্যে উপস্থাপিত দাবি হিসেবে আসে।
তিনি বলেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় আইন ও প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইন সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, কমিশনকে আরও কার্যকর করতে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমিশনের কাঠামো ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সুশাসনকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতি, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও সেই প্রক্রিয়ার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব অধিকার নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক সুরক্ষার গুরুত্ব রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও বক্তব্য দেন। তিনি মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলোচনা ও প্যানেল আলোচনা ছাড়াও রচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা এবং ‘আমেরিকান ফাউন্ডার্স মিউজিয়াম’ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ২৫০ বছর পূর্তিও উদযাপন করা হচ্ছে।

