রাজধানীর মহাখালী এলাকায় দীর্ঘদিনের যানজট ও সড়ক দখলের সমস্যা কমাতে নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে টার্মিনাল ও প্রধান সড়কে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা আন্তঃজেলা বাসগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে পূর্বাচলের অস্থায়ী বাস ডিপোতে।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো বাসের যাত্রার সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট আগে সেটি মহাখালী বাস টার্মিনালে প্রবেশ করতে পারবে। এরপর যাত্রী তোলার কাজ শেষ করে দ্রুত গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে হবে। প্রশাসনের লক্ষ্য, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মহাখালী এলাকার সড়কে এ ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমান প্রভাব তৈরি করা।
এরই মধ্যে পূর্বাচল অস্থায়ী বাস ডিপোতে আন্তঃজেলা বাস স্থানান্তর শুরু হয়েছে। মহাখালী বাস টার্মিনাল বাস মালিক সমিতির দৈনিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা পর্যন্ত ডিপোতে মোট ৯১টি বাস অবস্থান করছিল।
সমিতির তথ্যমতে, ওই দিন সকাল পর্যন্ত ডিপোতে নতুন করে ৭৪টি বাস প্রবেশ করে। এর মধ্যে ১০টি বাস আবার বের হয়ে যায়। নিয়মিতভাবে সেখানে ছিল ৬৪টি বাস। এর বাইরে আগে থেকেই ২৩টি বাস অবস্থান করছিল এবং মহাখালী টার্মিনাল থেকে নতুন করে আরও চারটি আন্তঃজেলা বাস ডিপোতে পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে ডিপোতে অবস্থানরত বাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯১টি।
মহাখালী বাস টার্মিনাল বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল বলেন, মহাখালী ও আশপাশের এলাকার যানজট কমাতে পূর্বাচলের ডিপোতে বাস স্থানান্তর শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যেসব বাসের এক ট্রিপের পর পরবর্তী ট্রিপের মধ্যে ৩ থেকে ৮ ঘণ্টা বিরতি থাকে, সেগুলো টার্মিনাল বা প্রধান সড়কে না রেখে ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০০টি বাস ডিপোতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০০টি বাস রাখার সুযোগ রয়েছে। অবকাঠামোগত কাজ শেষ হলে আরও ৫০ থেকে ৬০টি বাস রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
তবে যেসব বাসের পরবর্তী ট্রিপ খুব কাছাকাছি, সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী টার্মিনালে অবস্থান করতে পারবে। কোনো বাসের দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে ট্রিপ থাকলে সেটিকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টার্মিনালে ঢোকার সুযোগ দেওয়া হবে।
নতুন ব্যবস্থাপনায় মহাখালী টার্মিনালের সামনের প্রধান সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন থেকে নির্ধারিত স্টপেজ বা কাউন্টার থেকেই যাত্রী তুলতে হবে।
টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পর বাসকে আর সড়কে দাঁড়ানো যাবে না। গেট থেকে বের হয়ে সরাসরি গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে হবে। নিয়ম ভেঙে প্রধান সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তুললে সংশ্লিষ্ট চালক ও বাসের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মালিক সমিতি।
এ ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে তিন থেকে চার দিনের জন্য বাস চলাচল বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বাসকে এ ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
বুধবার বিকেলে মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাসগুলো সিরিয়াল অনুযায়ী টার্মিনাল থেকে বের হচ্ছে। এরপর প্রধান সড়কে দাঁড় না করেই যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে।
মহাখালীতে যানজটের অন্যতম কারণ ছিল দূরপাল্লার বাসের দীর্ঘ সময় অবস্থান। বিভিন্ন রুটের বাস সকালে ঢাকায় আসার পর রাতের ট্রিপের অপেক্ষায় দিনের বড় একটি সময় টার্মিনাল ও এর সামনের সড়কে দাঁড়িয়ে থাকত। এতে সড়কের জায়গা দখলের পাশাপাশি যানজটও বাড়ত।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো বাসের পরবর্তী ট্রিপ কয়েক ঘণ্টা পরে হলে সেটিকে মহাখালীতে অপেক্ষা না করিয়ে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে পাঠানো হবে। ট্রিপের নির্ধারিত সময়ের আগে বাসটি আবার মহাখালী টার্মিনালে এসে যাত্রী তুলে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, পূর্বাচলের ডিপোর কিছু অবকাঠামোগত কাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টিতে সেখানে রাখা বাস তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বাসকর্মীদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।
তবে এসব কাজ শেষ হলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষমাণ বাসগুলো পূর্বাচলের ডিপোতে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি। মহাখালীতে মূলত চলাচলরত বাস থাকবে এবং সেখান থেকেই যাত্রী ওঠানো ও নামানোর ব্যবস্থা থাকবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, মহাখালীর দীর্ঘদিনের যানজট ও সড়ক দখলের সমস্যা দূর করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এলাকায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন দূরপাল্লার রুট থেকে সকালে ঢাকায় আসা অনেক বাস রাতের ট্রিপের অপেক্ষায় দিনের বেশিরভাগ সময় মহাখালী এলাকায় অবস্থান করত। নির্দিষ্ট ডিপো না থাকায় সড়কেই বাস দাঁড়িয়ে থাকত, ফলে যানজট সৃষ্টি হতো।
এ সমস্যা সমাধানে রাজউকের পূর্বাচল ৩ নম্বর সেক্টরে অস্থায়ী বাস ডিপো তৈরি করা হয়েছে। এখন থেকে ট্রিপের মধ্যবর্তী সময়ে বাসগুলো মহাখালীর সড়কে না থেকে ওই ডিপোতে অবস্থান করবে।
মহাখালীর পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনাল ফুলবাড়িয়া ও সায়েদাবাদেও একই ধরনের ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল ও ডিপোর ব্যবস্থাপনা কাঁচপুরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।
এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যত্রতত্র গড়ে ওঠা টিকিট কাউন্টার সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। টার্মিনালগুলো সংস্কার করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। এর ফলে ই-টিকিটসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মহাখালী থেকে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে বাস স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় গত ১৫ জুলাই। তখন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, সড়ক থেকে বাস সরিয়ে নির্দিষ্ট ডিপোতে রাখলে মহাখালী এলাকায় যানজট কমার পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বাড়বে।
তবে ডিপোর অবকাঠামোগত কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় এবং বাসকর্মীদের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় ধাপে ধাপে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে পূর্বাচল অস্থায়ী ডিপোতে ৯১টি বাস অবস্থান করছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় আরও বাস সেখানে স্থানান্তর এবং মহাখালীর সড়কে নতুন ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার মাধ্যমে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই এলাকায় যানজট ও সড়ক দখলের সমস্যা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

