লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি কমানো কিংবা বিদ্যুৎ বিলের ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেকেই বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সোলার প্যানেল স্থাপনের কথা ভাবছেন। বাজারে ৪০০, ৫৫০, ৬০০ ওয়াটসহ বিভিন্ন ক্ষমতার সোলার প্যানেল পাওয়া যায়। তবে বেশি ওয়াটের প্যানেল মানেই যে সেটি সবার জন্য উপযুক্ত, এমন নয়। সোলার সিস্টেম কেনার আগে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা, ব্যবহারের সময়, চালাতে হবে এমন যন্ত্রপাতির ধরন এবং ব্যাকআপের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা জরুরি।
সোলার সিস্টেম বেছে নেওয়ার প্রথম ধাপ হলো নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব করা। দিনে মোট কত ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন এবং কোন যন্ত্র কতক্ষণ চলে, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে।
ফ্যান, লাইট, টেলিভিশন, ফ্রিজ, পানির পাম্প, কম্পিউটার ও এসির মতো যন্ত্রের বিদ্যুৎ খরচ আলাদাভাবে হিসাব করা ভালো। এই হিসাব ছাড়া শুধু ৫৫০ বা ৬০০ ওয়াটের প্যানেল কিনলে প্রয়োজনের তুলনায় ছোট কিংবা অতিরিক্ত ক্ষমতার সিস্টেম হয়ে যেতে পারে।
প্যানেলের ক্ষমতা নির্ধারণে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদার পাশাপাশি ওই এলাকায় সূর্যের আলো পাওয়ার পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো রোদ থাকলে একটি সোলার প্যানেল তার নির্ধারিত ক্ষমতা অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তবে বাস্তবে আবহাওয়া, ছায়া, প্যানেলের অবস্থান, তাপমাত্রা এবং সিস্টেমের বিভিন্ন পর্যায়ের ক্ষতির কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হতে পারে।
যেমন, ৫৫০ ওয়াটের একাধিক প্যানেল দিয়ে একটি সোলার সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু কয়টি প্যানেল প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদা ও স্থানীয় সূর্যালোকের হিসাব মিলিয়ে। তাই শুধু একটি প্যানেলের ওয়াট নয়, পুরো সোলার অ্যারের মোট উৎপাদন ক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত।
বাজারে মনোক্রিস্টালাইন, পলিক্রিস্টালাইনসহ বিভিন্ন ধরনের সোলার প্যানেল রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে এন-টাইপ ও দ্বিমুখী প্যানেলও পাওয়া যায়।
মনোক্রিস্টালাইন প্যানেল সাধারণত একই জায়গায় তুলনামূলক ভালো উৎপাদন দিতে পারে। আবার নির্দিষ্ট পরিবেশ ও স্থাপনার ক্ষেত্রে এন-টাইপ বা দ্বিমুখী প্রযুক্তির প্যানেলও ভালো ফল দিতে পারে। তাই শুধু নতুন বা উন্নত প্রযুক্তির নাম দেখে নয়, ছাদের জায়গা, বাজেট ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্যানেল নির্বাচন করা উচিত।
সোলার সিস্টেমে ব্যাটারি লাগবে কি না, সেটিও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। দিনের বেলায় সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং গ্রিডের সংযোগ থাকলে অন-গ্রিড সিস্টেম বিবেচনা করা যায়। এ ধরনের ব্যবস্থায় সাধারণত বড় ব্যাটারি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না।
তবে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরও রাতে ফ্যান, লাইট, রাউটার বা অন্যান্য যন্ত্র চালু রাখতে চাইলে ব্যাটারিসহ অফ-গ্রিড কিংবা হাইব্রিড সিস্টেম প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্যানেলের পাশাপাশি ব্যাটারির ধারণক্ষমতাও সঠিকভাবে হিসাব করতে হবে।
সোলার প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বাড়ির বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রে তা ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ইনভার্টার প্রয়োজন। তাই প্যানেল কেনার সময় ইনভার্টারের ক্ষমতা সোলার অ্যারে ও সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক লোডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অন-গ্রিড, অফ-গ্রিড নাকি হাইব্রিড—কোন ধরনের ইনভার্টার ও সিস্টেম প্রয়োজন হবে, তা নির্ভর করবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন এবং ব্যাকআপের প্রয়োজনীয়তার ওপর।
সোলার সিস্টেম সাধারণত দীর্ঘ সময় ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা হয়। তাই কেনার আগে প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওয়ারেন্টির মেয়াদ আলাদাভাবে জেনে নেওয়া উচিত।
কোনো যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলে বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠান কী ধরনের সেবা দেবে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া যাবে কি না এবং ওয়ারেন্টির শর্ত কী—এসব বিষয় লিখিতভাবে নিশ্চিত করা ভালো। শুধু কম দাম দেখে পণ্য কেনার বদলে মান ও বিক্রয়োত্তর সেবাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাড়ির জন্য সোলার প্যানেল কেনার ক্ষেত্রে শুধু একটি প্যানেলের দাম কিংবা ওয়াটের পরিমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা, প্যানেলের মোট উৎপাদন ক্ষমতা, ছাদের জায়গা, ইনভার্টারের সক্ষমতা, ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিবর্তন—সবকিছু বিবেচনা করেই সিস্টেম নির্বাচন করা উচিত।
সঠিক হিসাব করে সোলার সিস্টেম বেছে নিলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের ঝুঁকিও কমবে।

