ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) রুটে কনটেইনারবাহী ট্রেনের সংখ্যা নেমে এসেছে এক থেকে দুইটিতে। কোনো কোনো দিন এ রুটে একটি ট্রেনও চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও রংপুরগামী তেলবাহী ট্রেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, গম ও সার পরিবহনকারী ট্রেনের ক্ষেত্রেও। এতে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬০১, ৬০৩, ৬০৫ ও ৬০৭ নম্বর কনটেইনারবাহী ট্রেনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় দিনে সর্বোচ্চ চারটি ট্রেন চলাচল করত। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে দিনে এক থেকে দুইটিতে দাঁড়িয়েছে। অনেক দিন কোনো কনটেইনারবাহী ট্রেনই চলাচল করছে না।
তেল পরিবহনেও একই চিত্র দেখা গেছে। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী ৯৫১ নম্বর তেলবাহী ট্রেন আগে সপ্তাহে দুটি চললেও বর্তমানে মাসে একটি ট্রেনও নিয়মিত যাচ্ছে না। ৯৬১ নম্বর ট্রেনটি চট্টগ্রাম-শ্রীমঙ্গল রুটে সপ্তাহে এক থেকে দুটি চলাচল করলেও এখন মাঝে মাঝে মাসে একটি ট্রেন চলছে। আর ৯৮১ নম্বর তেলবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে রংপুরে সপ্তাহে একটি চলাচল করলেও গত তিন মাসে মাত্র একটি ট্রেন চলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া রংপুর বিসি, দিনাজপুর বিসি ও তারাকান্দি বিসি নামে খাদ্য, গম ও সারবাহী ট্রেন এবং আশুগঞ্জ সাইলোগামী গমবাহী ট্রেনও আগে নিয়মিত চলাচল করত। ইঞ্জিন সংকটে এসব ট্রেনের চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
রেলওয়ের সাম্প্রতিক তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা ২ হাজার ৭৭০টি থেকে কমে ১ হাজার ৪৬৭টিতে নেমেছে।
পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি এ খাত থেকে রেলের আয়ও ধারাবাহিকভাবে কমছে। রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় হয়েছে ৭৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৭৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় এক দশকের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এ খাতের আয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে কনটেইনার পরিবহন থেকে রেলের সর্বোচ্চ ১৩৫ কোটি টাকা আয় হয়েছিল। এরপর টানা চার বছর আয় কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৭৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পণ্য পরিবহনের পরিমাণও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেলওয়ে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন পণ্য পরিবহন করেছিল। গত অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে ৭ লাখ ৩০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম-কামালাপুর রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১১টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কনটেইনার ও তেলবাহী ট্রেনের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউলও ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সাইফুল রহমান বলেন, পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রতিদিন ১০ থেকে ১১টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগের মাসের তুলনায় চলতি মাসে ইঞ্জিনের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে চার থেকে পাঁচটি ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানের আশা করছেন তারা।
সিজিপিওয়াইয়ের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এনামুল হক সিকদার বলেন, ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। তবে কয়েক মাস আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে সিজিপিওয়াই থেকে দুই-তিনটি কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল করছে। ট্রেন চলাচল কম থাকায় আগে ইয়ার্ডে কনটেইনারের স্তূপ তৈরি হলেও এখন সেই পরিস্থিতি নেই।
তবে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিন বরাদ্দ থাকার পরও যাত্রীবাহী ট্রেনে ইঞ্জিন বিকল হলে অনেক সময় পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য নির্ধারিত ইঞ্জিন সেদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউল আরও ব্যাহত হয়।
রেলওয়ের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-কামালাপুর রুটে কনটেইনার পরিবহন রেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়কারী খাত। একটি কনটেইনারবাহী ট্রেন সিজিপিওয়াই থেকে ঢাকার আইসিডিতে গেলে রেলের প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটে এ ধরনের ট্রেন নিয়মিত চালানো না যাওয়ায় সম্ভাব্য আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে।
রেলপথে পণ্য পরিবহন সড়কপথের তুলনায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সড়কপথে পণ্য পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ২০ ফুটের একটি কনটেইনার রেলে পরিবহনে খরচ প্রায় ৯ হাজার ৭০০ থেকে ১৬ হাজার ১০০ টাকা। তবে সময়মতো পরিবহন নিশ্চিত না হলে ব্যবসায়ীরা বিকল্প হিসেবে সড়কপথ ব্যবহার করছেন।
ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনাতেও। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে প্রয়োজনীয় ১৩টি ইঞ্জিনের বিপরীতে মাত্র দুটি ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছিল। একপর্যায়ে বন্দরের ইয়ার্ডে ১ হাজার ২০০টির বেশি টিইইউ কনটেইনার আটকে ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, গত মাসে বন্দরে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে কাস্টমস ও রেলওয়েকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রেল যোগাযোগ নিয়মিত থাকলে কনটেইনারের জট কম থাকবে। তাই পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল নিয়মিত রাখা প্রয়োজন।
এদিকে কমলাপুর আইসিডির কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনে অনিয়ম এবং আমদানিকারকদের ওপর ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জ আরোপ বন্ধে গত ২৫ আগস্ট রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক আহমেদের সই করা চিঠিতে পর্যাপ্ত রেল ইঞ্জিনের অভাব, অনিয়মিত ট্রেন পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুর আইসিডিমুখী কনটেইনার পরিবহন কমে যাওয়ায় আইসিডির কার্যক্রম অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বন্দরে কনটেইনার পড়ে থাকায় আমদানিকারকদের ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জ দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি কাঁচামাল সরবরাহসহ দেশের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইঞ্জিনের সংখ্যা কিছুটা বাড়ায় বর্তমানে আগের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল বেড়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ইঞ্জিন এখনো অপ্রতুল।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সহসভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ইঞ্জিন সংকটে পণ্যবাহী ট্রেন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে পারছেন না। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় ঢাকার আইসিডিতে কনটেইনার পাঠানো যাচ্ছে না, আবার কারখানায় কাঁচামালও সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তিনি দ্রুত পর্যাপ্ত ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করে পণ্যবাহী ট্রেনের নিয়মিত শিডিউল ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। তার মতে, এ বিষয়ে সরকার ও রেলওয়াকে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন নিশ্চিত করে পণ্যবাহী ট্রেনের নিয়মিত চলাচল ফিরিয়ে আনা না গেলে রেলের রাজস্ব কমার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ও দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ আরও বাড়তে পারে।

