রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

সাড়ে পাঁচ বছর পর ডলারের বিপরীতে ঘুরে দাঁড়াল টাকা

নিউজ ডেস্ক

দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবমূল্যায়নের ধারা চলছিল, তাতে এবার পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে বাংলাদেশি টাকার মান দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হয়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ধারাবাহিকভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। এ সময়ে প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ ওই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমেছে ৩৮ টাকা ২০ পয়সা বা ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। ৩০ আগস্ট ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠার পর ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে টাকার মান বেড়েছে ৯৫ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে আসে। অর্থাৎ ওই এক বছরে ডলারের দাম ১০ পয়সা কমেছিল এবং টাকার মান বেড়েছিল দশমিক ১২ শতাংশ।

করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে দেশে ডলারের চাহিদা ও সংকট কম ছিল। এর ফলে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী অবস্থায় ছিল।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২১ সাল থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে আমদানিও বাড়তে থাকে। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে টাকার মান কমে যায় ১ দশমিক ১৮ শতাংশ।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ে। একই সময়ে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় ডলারের সংকট আরও তীব্র হয়।

এর প্রভাবে ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ১০৫ টাকা ৮৫ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে ডলারের দাম বাড়ে ২০ টাকা ৫ পয়সা বা ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

এরপরও টাকার ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতি ডলারের দাম ১১০ টাকায় ওঠে। ওই বছরে ডলারের দাম বাড়ে ৪ টাকা ১৫ পয়সা বা ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম আরও ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছরে টাকার মান কমে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

২০২৫ সালেও একই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে প্রতি ডলারের দাম বেড়ে ১২২ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে ডলারের দাম বাড়ে ২ টাকা ৩৩ পয়সা বা ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

চলতি বছরে এসে দীর্ঘদিনের সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে টাকার মান কমার পরিবর্তে দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়েছে।

এরপর আগস্টের শেষ দিকে ডলারের দর কিছুটা বাড়লেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আবার কমে আসে। ৩০ আগস্ট ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এ সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে বেশ কয়েকটি দেশের মুদ্রার মান কমেছে।

এ সময়ে ভারতের রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মুদ্রার মান কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহও হারিয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ মূল্য।

অন্যদিকে একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও চীনের ইউয়ানের মান প্রায় ৪ শতাংশ করে বেড়েছে। পাকিস্তানি রুপির মান বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় অবমূল্যায়নের পর সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি টাকার বিনিময়মূল্যে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ে। একই পরিমাণ ডলার কিনতে আমদানিকারকদের বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। এর ফলে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্যসহ আমদানিনির্ভর বিভিন্ন পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়।

পরবর্তীতে এই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়ে। পণ্যের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। এতে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে।

বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রেও টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব রয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকা দুর্বল হলে একই পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। ফলে টাকার হিসাবে বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়ে যায়।

অন্যদিকে টাকা শক্তিশালী হলে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার হিসাবে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে এর সামগ্রিক প্রভাব নির্ভর করে আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন