রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি বন্ধে কঠোর নির্দেশনা

নিউজ ডেস্ক

কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত সব মাদ্রাসায় অবিলম্বে ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন ও কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব কথা জানানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ইসলাহী ও তারবিয়াতি কার্যক্রম জোরদার এবং মাদ্রাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ ও অভিযোগ প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শাসনের উদ্দেশ্য হবে তাদের সংশোধন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। কোনো অবস্থাতেই শাস্তি প্রতিশোধের মাধ্যম হতে পারবে না। রাগ বা উত্তেজিত অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী সংশোধনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা করার পরও সংশোধন না হলে অভিভাবককে ডেকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিভাবকের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

তবে কোনো পরিস্থিতিতেই ছাত্র বা ছাত্রীকে শাস্তি হিসেবে প্রহার করা যাবে না। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা শরীরে দাগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পাশাপাশি প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটূক্তি, ঘৃণাসূচক নামে সম্বোধন কিংবা অন্য কোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণ থেকেও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন—উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি।

তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে পুরো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের দায় মাদ্রাসা, বোর্ড বা সামগ্রিক আলেম-উলামা ও ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয় বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এটি তৈরির ক্ষেত্রে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ উলামায়ে দেওবন্দের তা‘লীম-তারবিয়াতবিষয়ক রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ জানানোর সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

কোনো মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শাসনের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহী মজলিস আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

এর মাধ্যমে অভিভাবকদের সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক জোরদার এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত কর্তৃপক্ষের নজরে আনার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

মাদ্রাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধে প্রতিটি বোর্ডকে তাদের অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য পৃথক মনিটরিং সেল গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণে আলাদা হটলাইন চালুর নির্দেশ দিয়েছে আল-হাইআতুল উলয়া।

কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বোর্ডগুলোর আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ)-এ যোগাযোগ করা যাবে বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় দেশের সব কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন