ইউরোপের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধসহ জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি সব নাগরিককে তিন দিনের খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়েছে।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন করে এমন কোনো বাধ্যতামূলক আইন জারি করেনি। বরং বড় ধরনের সংকট বা দুর্যোগের সময় নাগরিকরা যেন অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি বাড়ানোর নীতি নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’তে জনগণের ন্যূনতম ৭২ ঘণ্টার স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে নির্দেশিকা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
ইউরোপীয় প্রস্তুতি পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে নানা ধরনের জরুরি পরিস্থিতির আশঙ্কা। বড় ধরনের দুর্যোগ বা সংকটে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ বা ব্যাহত হতে পারে। একই সময়ে জরুরি সেবা ও উদ্ধারকারী দলকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে।
এই বাস্তবতায় সংকটের প্রথম কয়েক দিন নাগরিকদের নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ। ইউরোপীয় কমিশনের কৌশলে যুদ্ধের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, স্বাস্থ্য সংকট, সাইবার হামলা ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিকেও প্রস্তুতির আওতায় রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতিকে শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপের প্রস্তুতি নীতিতে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিকদের সচেতন ও প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সে ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতির বিষয়টি সরকারি নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক নিরাপত্তা বিভাগ নাগরিকদের এমন একটি জরুরি কিট প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে সংকটের সময় অন্তত তিন দিন স্বনির্ভর থাকা যায়।
ফরাসি সরকারি তালিকায় জরুরি কিটে পানীয় পানি, রান্নার প্রয়োজন নেই এমন দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ব্যাটারিচালিত রেডিও, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, মোবাইল ফোনের চার্জার, নগদ অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি এবং বাড়ি ও গাড়ির অতিরিক্ত চাবি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি সরকারি নির্দেশনায় প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রায় ৬ লিটার বোতলজাত পানি রাখার কথাও বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এই প্রস্তুতি কাজে লাগবে বলে জানানো হয়েছে।
২০২৬ সালেও ফ্রান্সের সরকারি নাগরিক সুরক্ষা নির্দেশনায় ৭২ ঘণ্টার জরুরি কিটের পরামর্শ বহাল রয়েছে। এমনকি বনভূমিতে আগুনের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ কয়েক দিনের জন্য স্বনির্ভর থাকার মতো জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও একই ধরনের নাগরিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বেলজিয়ামের জাতীয় সংকটকেন্দ্র নাগরিকদের অন্তত তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার মতো জরুরি কিট প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বা ইন্টারনেট সাময়িকভাবে না থাকলেও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতে রাখার কথা বলা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস সরকারের জরুরি কিটের তালিকাতেও টর্চ, চার্জযুক্ত পাওয়ারব্যাংক, অতিরিক্ত ব্যাটারি, গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি, নগদ অর্থ, ব্যাটারিচালিত রেডিও, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পানি রাখার পরামর্শ রয়েছে। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন ৩ লিটার পানি এবং অপচনশীল খাবারের কথা বলা হয়েছে।
৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার ধারণাটি নতুন নয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ, সাইবার হামলার ঝুঁকি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ায় ইউরোপে সামগ্রিক সংকট প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তুতি কৌশলেই বলা হয়েছে, মহামারি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ইউরোপের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কৌশলটির লক্ষ্য শুধু সরকার নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরকে সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির আওতায় আনা।
এখানে নাগরিক পর্যায়ের প্রস্তুতিকে জরুরি সেবা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সংকটের শুরুতে একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেলজিয়ামের সংকটকেন্দ্রও বলছে, কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা ও উদ্ধারকারী দল একসঙ্গে সবার কাছে পৌঁছাতে নাও পারে। তাই পরিবার পর্যায়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকলে জরুরি সেবাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের দিকে দ্রুত মনোযোগ দিতে পারে।
৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতিকে সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতি বলা ঠিক হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব নীতিতেই প্রস্তুতির আওতায় একাধিক ধরনের দুর্যোগ ও সংকটের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে নাগরিক প্রস্তুতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে, সেটিও স্পষ্ট। ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তুতি নীতিতে বেসামরিক ও সামরিক প্রস্তুতি পাশাপাশি থাকলেও নাগরিকদের জন্য ৭২ ঘণ্টার স্বনির্ভরতার লক্ষ্যটি মূলত সামগ্রিক সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপে এখন যে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো—বড় কোনো সংকট দেখা দিলে নাগরিকদের যেন অন্তত কয়েক দিনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা থাকে। এজন্য খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, আলো, যোগাযোগের সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ নথির মতো জিনিস আগে থেকে প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘ইউরোপজুড়ে নতুন করে ৭২ ঘণ্টার খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ’—এই বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’তে ৭২ ঘণ্টার ন্যূনতম স্বনির্ভরতার জন্য নির্দেশিকা তৈরির কথা বলা হয়েছিল; এটিকে সব নাগরিকের ওপর আরোপ করা নতুন বাধ্যতামূলক মজুত আইন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে অবশ্য ৭২ ঘণ্টার জরুরি কিট নিয়ে নির্দিষ্ট সরকারি পরামর্শ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের ঘোষণা নয়; বরং বড় ধরনের দুর্যোগ, জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়া কিংবা অন্য কোনো সংকটের প্রথম কয়েক দিনে নাগরিকদের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা বাড়ানো।

