যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিজ দেশের পরিবর্তে এমন তৃতীয় দেশে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসীকে ডিপোর্ট করেছে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক বা পূর্ব যোগাযোগ নেই। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২৫ হাজার ৪৪৭ জনকে ২৮টি দেশে পাঠানো হয়েছে বলে এক আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
‘ফরবিডেন স্টোরিজ’-এর নেতৃত্বে ১৫টি দেশের ২৬টি সংবাদমাধ্যমের ৭২ জন সাংবাদিকের একটি কনসোর্টিয়াম ছয় মাস ধরে এই অনুসন্ধান চালায়। এতে শতাধিক সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং অভিবাসী অধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ৩৫টি দেশের সঙ্গে তৃতীয় দেশের নাগরিকদের গ্রহণের বিষয়ে চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছেছে। এসব চুক্তির বড় অংশের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, তৃতীয় দেশে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজারকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আরও ২৭টি দেশে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪১০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ বা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের পর্যালোচনা করা সরকারি নথিতে উঠে এসেছে।
এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার সরাসরি বিভিন্ন দেশের সরকারকে দেওয়ার জন্য এবং প্রায় ১৭৯ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাকে (আইওএম) ও প্রায় ১২৪ মিলিয়ন ডলার জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি সহজ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
চুক্তিগুলোর বেশির ভাগ আলোচনার দায়িত্ব নিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘অফিস অব রিমাইগ্রেশন’। ২০২৫ সালের মে মাসে গঠিত এই বিভাগটি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তৃতীয় দেশের নাগরিকদের গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা ও অর্থসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখছে।
তৃতীয় দেশে অভিবাসীদের পাঠানোর বিষয়ে হোয়াইট হাউসের বক্তব্যও অনুসন্ধানে তুলে ধরা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব অভিবাসীর নিজ দেশ তাদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে অথবা যারা নিজ দেশে ফিরতে চাননি, তাদেরই তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বলেন, তৃতীয় দেশে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে নিজ দেশের সরকার যাদের গ্রহণ করছে না এবং যাদের বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশনের আদেশ রয়েছে, এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
তবে অনুসন্ধানে আইনজীবী ও অভিবাসী অধিকারকর্মীদের অভিযোগও উঠে এসেছে। তাদের দাবি, কিছু অভিবাসীকে এমন দেশে পাঠানো হয়েছে যেখানে তাদের কোনো পূর্ব সম্পর্ক নেই এবং সেখানে তাদের আইনি সুরক্ষা সীমিত হতে পারে।
এদিকে তৃতীয় দেশে ডিপোর্টেশনের এই প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি লড়াইও চলছে। ১৮ সেপ্টেম্বর বোস্টনভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সার্কিট কোর্ট অব আপিলস ট্রাম্প প্রশাসনের তৃতীয় দেশে ডিপোর্টেশন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছে।
তিন বিচারকের বেঞ্চের সর্বসম্মত রায়ে বলা হয়েছে, কোনো অভিবাসীকে এমন তৃতীয় দেশে পাঠানোর আগে তাকে কার্যকরভাবে নোটিশ দিতে হবে এবং সেখানে নিপীড়ন বা নির্যাতনের আশঙ্কা থাকলে তা চ্যালেঞ্জ করার অর্থবহ সুযোগ দিতে হবে।
আদালত একই সঙ্গে বলেছে, শুধু সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে কূটনৈতিক আশ্বাস পাওয়াই যথেষ্ট নয়। তৃতীয় দেশে পাঠানোর আগে অভিবাসীদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানোর সুযোগ দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দেশে ডিপোর্টেশন ব্যবস্থা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির একটি অংশ হিসেবে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তৃতীয় দেশে পাঠানো মানুষের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়ালেও এটি ট্রাম্প প্রশাসনের মোট ডিপোর্টেশনের তুলনায় একটি অংশ মাত্র।
তবে কোথায় পাঠানো হচ্ছে, কী শর্তে পাঠানো হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কী ধরনের আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের আপিল আদালতের রায়ের ফলে তৃতীয় দেশে পাঠানোর আগে নোটিশ ও চ্যালেঞ্জের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

