রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

আল্লাহর কসম করে তুরস্ক-পাকিস্তানকে সতর্ক করল হুথিরা

নিউজ ডেস্ক

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা এবং হামলা বাড়ার মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্ককে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথিরা। সৌদি আরবের পক্ষে ইয়েমেন সংঘাতে সামরিকভাবে জড়ালে দুই দেশকে ‘কঠোর ও নির্মম’ জবাব দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছেন গোষ্ঠীটির এক শীর্ষ নেতা।

ইরাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অ্যানাদার রিডিং’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও ধামার প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ আল-বুখাইতি।

তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তান যদি ইয়েমেন সংঘাতে সামরিকভাবে যুক্ত হয়, তাহলে তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানা হবে। সৌদি আরবের পক্ষে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করলে দুই দেশকে ‘একটি শিক্ষা’ দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।

তবে আল-বুখাইতি বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইয়েমেনের প্রতি গভীর সহানুভূতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হুথিদের এই সতর্কবার্তা মূলত দুই দেশের সরকারের উদ্দেশে—যদি তারা সামরিকভাবে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ায়।

সৌদি আরবের ওপর হুথিদের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলার পর রিয়াদ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই পাকিস্তান ও তুরস্ককে লক্ষ্য করে হুথিদের পক্ষ থেকে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো।

চলতি বছরের ৭ আগস্ট তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে তিনপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে যৌথ দায়িত্ব ও সুরক্ষার নীতিতে এই চুক্তি করা হয়। চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা।

চুক্তি অনুযায়ী, অংশীদার কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব অংশীদার দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা রয়েছে।

হুথিদের হুমকির মধ্যেই সৌদি আরবের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে এবং জোটের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তুরস্ক রিয়াদের পাশে রয়েছে।

হাকান ফিদানের ভাষ্য, সৌদি আরবের সামরিক পর্যায়ের সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি।

রিয়াদের তেল স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়ে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জোট পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর দেশটিতে সংঘাত তীব্র হয়। এর পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে হুথিরা রিয়াদের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নিজেদের অগ্রগতির দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। সৌদি আরবের বিভিন্ন তেল স্থাপনাতেও হামলার দাবি করেছে তারা।

এসব হামলা ও পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলার শুরু থেকেই এর নিন্দা জানিয়ে আসছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এসব হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে রিয়াদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে।

মক্কার কাছে হামলার খবরের পর পাকিস্তানের অবস্থান আরও কঠোর হয়। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মক্কা ও মদিনার সুরক্ষা দেওয়া পাকিস্তানের জন্য ‘চিরন্তন চুক্তি’ ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

তিনি বলেন, পবিত্র কাবা বা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থানে হামলা হলে কোনো চুক্তির অপেক্ষা না করে তা রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব।

পরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আন্তঃসেবা জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরীও একই ধরনের অবস্থান জানান। তিনি বলেন, হারামাইন শরিফাইনের সুরক্ষায় পাকিস্তান ‘যেকোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত।

হুথিদের হুঁশিয়ারি, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং রিয়াদের প্রতি দুই দেশের সাম্প্রতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে ইয়েমেন সংঘাতকে ঘিরে আঞ্চলিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন