বিশ্বের সংকট মোকাবিলায় যুদ্ধ, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক প্রভাব নয়—আন্তর্জাতিক আইন, সংযম ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার—বিশ্বের এসব সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক ক্ষমতার দ্রুত পরিবর্তন।
গুতেরেস বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্র, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তির হাতে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রীভবন ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তির ভিত্তিতে নয়, আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতা ক্রমে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের কাছ থেকে যন্ত্রের দিকে ক্ষমতা স্থানান্তরের প্রবণতাও বাড়ছে, যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার বিকাশও রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো এসব পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর ফলে বিশ্বের বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। গুতেরেসের ভাষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির প্রসঙ্গ তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ তাঁর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দেখা অন্য অনেক সংকটের তুলনায় নজিরবিহীন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও আদালতের আদেশ সব পক্ষকেই মেনে চলতে হবে। গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং জাতিসংঘের কর্মীদের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়েও তিনি জোর দেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কথা বলেন জাতিসংঘ মহাসচিব। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ জাতিসংঘ সনদের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর কারণে ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষ এখনো প্রাণ হারাচ্ছেন।
এর আগে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে গুতেরেস ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের ভিত্তিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতিকে বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তুলে ধরেন গুতেরেস। তাঁর মতে, প্রযুক্তির বিকাশ শুধু অর্থনীতি বা মানুষের জীবনযাত্রাকেই বদলে দিচ্ছে না, বিশ্বরাজনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব এআই ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে এর ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও এগিয়ে নিতে হবে।
গুতেরেস বলেন, একুশ শতকে শান্তিকে শুধু যুদ্ধ বা সংঘাত না থাকার অর্থে দেখলে হবে না। শান্তির জন্য সংযম, আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত কিংবা অর্থনৈতিক শক্তি একা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং কার জীবন ও ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত মাপকাঠি শক্তি হবে না।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন গুতেরেস। বিশেষ করে পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে তিনি অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য হলো চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে ১০টি অস্থায়ী সদস্যপদ অঞ্চলভিত্তিকভাবে বণ্টন করা হলেও এসব সদস্যের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
গুতেরেস বলেন, একুশ শতকের বাস্তবতা প্রতিফলিত করতে নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আফ্রিকান ইউনিয়নও দীর্ঘদিন ধরে পরিষদে আফ্রিকার জন্য দুটি স্থায়ী এবং আরও দুটি অস্থায়ী আসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে গুতেরেসের বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে ৮১তম সাধারণ পরিষদে দেওয়া এই ভাষণ তাঁর মহাসচিব হিসেবে শেষ সাধারণ বিতর্কের বক্তব্যও।

