রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে জায়গার সংকটে একই এলাকায় হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি নবজাতক ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুরাও একই জায়গায় এসে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। এতে হাসপাতাল থেকেই এক রোগীর শরীরে অন্য রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এমন চিত্র দেখা যায়। ৬০ শয্যার এই ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি ছিল প্রায় ২৭০ জন। তাদের চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র দুইজন মেডিকেল অফিসার ও তিনজন নার্স। জায়গার সংকটে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝে ও জরুরি অক্সিজেন বেডেও শিশুদের চিকিৎসা চলছিল।
ওয়ার্ডের সামনে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন কয়েকজন রোগীর স্বজন। তাদের মধ্যে মো. মাইনুদ্দীনের কোলে ছিল আট মাসের শিশু জাবের। শিশুটির শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ায় পরিবারের সন্দেহ, সে হামে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তারা কোনো সিট পাননি।
মাইনুদ্দীন কখনো নার্সদের কক্ষে, কখনো চিকিৎসকদের কক্ষে গিয়ে ছেলের জন্য একটি সিটের অনুরোধ করছিলেন। প্রতিবারই তাকে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে শ্বাসকষ্টে কান্না করছিল জাবের। পরিবারের অভিযোগ, তখনও তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জাবেরের আশপাশ দিয়ে একদিনের নবজাতকসহ বিভিন্ন বয়সী শিশুরা যাতায়াত করছিল। ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুরাও একই জায়গায় মায়েদের সঙ্গে অবস্থান করছিল। ফলে হাম-সন্দেহভাজন শিশুর সংস্পর্শে অন্য শিশুদের আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।
ওয়ার্ডের অন্য পাশে জরুরি অক্সিজেন বেডে স্যালাইন চলছিল তিন বছরের ইয়ামিনের। শিশুটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। মা শারমিন আক্তার জানান, প্রায় চার ঘণ্টা ধরে তারা সেখানে অবস্থান করছেন। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে কোনো সিট নেই। নিচে শুয়ে রাখার মতো জায়গাও নেই। শিশুটির শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে সেখানেই স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে।
ইয়ামিনের মাত্র দেড় থেকে দুই ফুট দূরে বসেছিলেন পাঁচ দিনের একটি নবজাতককে কোলে নিয়ে তার দাদি পারভীন বেগম। নবজাতকটির হাতে তখন ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইন চলছিল। পারভীন জানান, ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না থাকায় বাইরে রেখেই নবজাতকটির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লার হোমনা থেকে তিন বছরের বাইজিদকে নিয়ে রোববার রাতে মুগদা হাসপাতালে আসেন তার বাবা জিলানি। একদিন পার হলেও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে সিট পাননি তারা। ওয়ার্ডের বাইরে এক কোণে সাদা কাপড় বিছিয়ে মেঝেতেই ছেলেকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাথার ওপরে ফ্যানও নেই। মা শিল্পী খানম হাতপাখা দিয়ে ছেলেকে বাতাস করছেন।
জিলানি জানান, ১০ দিন ধরে জ্বর আসা-যাওয়া করছিল বাইজিদের। প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রোববার সকালে তাকে হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর ঢাকায় নিয়ে আসতে বলা হয়।
অন্যদিকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চার দিন মেঝেতে থাকার পর সোমবার সকালে সিট পেয়েছেন শিশু আইরিনের পরিবার। বাবা মাসুদ আহমেদ জানান, এ সময়ের মধ্যে মেয়েটির শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্লাটিলেটও কমে গেছে। ওয়ার্ডে অতিরিক্ত গরম ও রোগীর চাপের কারণে শিশুটি আরও অস্থির হয়ে পড়ছে বলেও জানান তিনি।
মুগদা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার ডা. নুশরাত জাহান বলেন, বর্তমানে ওয়ার্ডে হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। ৬০ শয্যার ওয়ার্ড হলেও এখানে প্রায়ই ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী থাকে।
তিনি জানান, হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে বর্তমানে কোনো সিট খালি নেই। একই অবস্থা ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও। ফলে নির্ধারিত ওয়ার্ডের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় রোগীদের রাখতে হচ্ছে।
ডা. নুশরাত বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের অন্য রোগীদের সংস্পর্শে না আসতে বলা হয়। কিন্তু জায়গার সংকট ও অতিরিক্ত রোগীর কারণে তা সবসময় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে হাসপাতালের ভেতরেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক ডেঙ্গু রোগী মুগদা হাসপাতালে আসছেন। স্থানীয় উপজেলা হাসপাতালেই অনেক রোগীর চিকিৎসা সম্ভব হলেও তারা ঢাকায় চলে আসায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের ২০২৫ সালে সরকার নির্ধারিত চিকিৎসা নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হাম ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের রোগীদের একই জায়গায় রাখার বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালগুলো বর্তমানে হামের সংক্রমণের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে।
তার মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো শিশু যদি একই সঙ্গে হামে আক্রান্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। পর্যাপ্ত আইসোলেশনের ব্যবস্থা না থাকলে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মুশতাক হোসেন বলেন, উপজেলা পর্যায়ে রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। ডেঙ্গু রোগীদের উপজেলা ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া গেলে ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে হাম আক্রান্ত শিশুদের অন্যান্য রোগীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকামুখী রোগীর চাপের পেছনে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার সংকটও দায়ী বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন। তার ভাষ্য, উপজেলা পর্যায়ে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে চিকিৎসকদের ওপর হামলার আশঙ্কা থাকায় অনেক চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে গুরুতর ও সাধারণ—দুই ধরনের রোগীকেই ঢাকার হাসপাতালে পাঠানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের বদলে বিভিন্ন সময় ছোটখাটো বিষয় নিয়ে চিকিৎসকদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করা হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ছে বলে তাঁর দাবি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু ও হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিশুদের হাসপাতালের মধ্যেই হাম, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২০০ হাম আক্রান্ত শিশু এবং তাদের ১০০ মায়ের তথ্য নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে ‘এআরএফ’ নামে একটি সংস্থা।
গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই তথ্য হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকটি তুলে ধরে।
গবেষণার প্রধান অনুসন্ধানকারী (প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটের কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে। এতে হামসহ অত্যন্ত সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
মুগদা হাসপাতালের বর্তমান চিত্রে তাই শুধু শয্যা সংকট নয়, একই সঙ্গে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বিশেষ করে হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের সঙ্গে নবজাতক, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের একই জায়গায় চিকিৎসা চলতে থাকলে হাসপাতাল নিজেই নতুন সংক্রমণের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

