কোটি কোটি টাকার ঋণ। ব্যাংক ও অন্যান্য পাওনাদারের চাপ। ঋণ আদায়ে একের পর এক মামলা। ব্যবসায় লোকসান কিংবা ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার কথা জানিয়ে এবার নিজেকেই দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করছেন এক শ্রেণির ঋণখেলাপি।
ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে বর্তমানে এমন ১৯৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরেই ৪৬ জন ঋণখেলাপি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আদালতে আবেদন করেছেন। গত বছরও এ ধরনের আবেদন করেছিলেন ৮১ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা হারানো ব্যক্তিদের জন্য দেউলিয়া আইন একটি আইনি সুযোগ। তবে এই আইনি সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কেউ কেউ ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজন বা অন্য ব্যক্তির নামে সম্পদ গড়ে তা গোপন করে কম সম্পদ দেখিয়ে দেউলিয়া হওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাদের মতে, দেউলিয়া মামলা গ্রহণের আগে আবেদনকারীর প্রকৃত সম্পদের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। সম্পদের তথ্য গোপন করে দেউলিয়া হওয়ার চেষ্টা করলে আইনে শাস্তির বিধানও রয়েছে।
ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতের সেরেস্তাদার মো. মানিক জানান, গত আগস্ট পর্যন্ত আদালতে মোট ১৯৭টি দেউলিয়া মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলায় আবেদনকারীরা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেছেন।
তিনি জানান, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৪৬টি আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন ঋণখেলাপির আবেদন ঠিকানা ও তথ্য সঠিক না থাকায় খারিজ হয়েছে। আরেকজন আবেদনকারী নিজের মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
দেউলিয়াবিষয়ক আইন, ১৯৯৭ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দেনা পরিশোধে অক্ষম হলে এবং আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন। আবেদনে সব পাওনাদারের নাম, তাদের পাওনার পরিমাণ এবং ঋণ পরিশোধে নিজের অক্ষমতার বিষয় উল্লেখ করতে হয়।
আদালত আবেদন গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট পাওনাদারদের কাছে সমন পাঠানো হয়। এরপর বিবাদীরা লিখিত জবাব দেন। মামলায় সাক্ষ্য, জেরা ও যুক্তিতর্কের প্রক্রিয়া শেষে আদালত কোনো ব্যক্তিকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারেন।
দেউলিয়া ঘোষণার পর দায়মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে আবেদন করতে হয়। আদালত নিয়োজিত রিসিভার তখন ওই ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করেন।
সম্পদ বিক্রির পর পাওনাদারের দায় পরিশোধ করে অর্থ অবশিষ্ট থাকলে আদালত তাকে দায়মুক্ত ঘোষণা করতে পারেন। আর সম্পদের পরিমাণ পাওনাদারের মোট পাওনার চেয়ে কম হলে তাকে দায়গ্রস্ত দেউলিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।
কোনো ব্যক্তি দেউলিয়া ঘোষিত হলে তার ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ হয়। আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি দেশের বাইরে যেতে পারেন না। নতুন করে ব্যাংকঋণ নেওয়া এবং কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও থাকে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
আইনে দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার জন্য সরাসরি শাস্তির বিধান না থাকলেও সম্পদের তথ্য গোপন করার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। কেউ সম্পদ গোপন করে দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করলে পরে সেই সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে তার সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এমনই একটি মামলা করেছেন মেসার্স সাহিন ট্রেডিং ও সাহিন স্টিল ওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী মো. শাহিন হোসেন (৪৭)। ব্যবসা সম্প্রসারণ ও পরিচালনার জন্য তিনি সিটি ব্যাংক লিমিটেড থেকে বিভিন্ন সময়ে ঋণ নিয়েছিলেন।
মামলার আবেদনে শাহিন উল্লেখ করেন, সুদসহ তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ২৭৫ টাকা। ব্যবসায় লোকসানের কারণে তিনি ওই ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি বলে দাবি করেন।
সিটি ব্যাংক ছাড়াও তার আরও কয়েকজন পাওনাদার রয়েছেন। পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য তারা বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করেন শাহিন। তার দাবি, এ পরিস্থিতিতে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বাইরে বের হতে পারছেন না এবং কোনো উপার্জনও করতে পারছেন না। এতে পরিবারটি অর্থকষ্টে পড়েছে।
এ অবস্থায় নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই দাবি করে চলতি বছরের ২২ জুলাই ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে মামলা করেন শাহিন। দেউলিয়াবিষয়ক আইন, ১৯৯৭-এর ১০ ধারায় করা মামলায় বিবাদী করা হয়েছে সিটি ব্যাংক লিমিটেডকে।
মামলার আবেদনে শাহিন আরও দাবি করেন, তার নামে কোনো পৈতৃক সম্পদ নেই। তার ব্যবহারিক জিনিসপত্র বিক্রি করলে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে। সিটি ব্যাংকের সুদসহ পাওনা পরিশোধে তিনি সম্পূর্ণ অক্ষম দাবি করে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেন।
আদালত নথি পর্যালোচনা করে গত ২৭ আগস্ট ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ধার্য তারিখে একটি প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। তবে আরেকটি প্রতিবেদন না আসায় মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ১৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
শাহিনের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী শিহাব শাহরিয়ার বলেন, তার মক্কেল ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের জন্য সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর সময় না দেওয়ায় এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হওয়ায় তিনি দেউলিয়া আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
আইনজীবীর দাবি, নারায়ণগঞ্জে শাহিনের একটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে এবং আরও কিছু সম্পদ ব্যাংকের কাছে বন্ধক রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বন্ধক রাখা সম্পদ নিয়ে নিলেও তার আপত্তি নেই। তবে তার দাবি, বাকি পাওনা পরিশোধের মতো সক্ষমতা তার নেই।
চলতি বছরের জুলাইয়ে স্ত্রী ফেরদৌসী আরা ও ছেলে ফজলুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেন মিটফোর্ডের মেসার্স আয়েশা এন্টারপ্রাইজের মালিক নজরুল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠানে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি বিভিন্ন পণ্য পাইকারি বিক্রি করা হয়।
ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি থেকে দুই দফায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন নজরুল। পরে ব্যবসায় লোকসান দেখা দেয় বলে আবেদনে উল্লেখ করেন তিনি।
নজরুলের দাবি, বিভিন্ন মানুষের কাছে তার ব্যবসার ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। তবে সেই অর্থ তিনি আদায় করতে পারছেন না। ঋণের টাকা আদায়ে ট্রাস্ট ব্যাংক ঢাকার অর্থঋণ আদালত-৬-এ একটি মামলা করেছে। অন্য একটি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।
দেউলিয়া মামলায় নজরুল উল্লেখ করেন, ঋণ পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অবশিষ্ট জীবন ঋণমুক্তভাবে কাটাতে তাকে ও পরিবারের সদস্যদের দেউলিয়া ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। এ মামলায় পাওনাদার হিসেবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনকে বিবাদী করা হয়েছে।
আদালত নথি পর্যালোচনা করে দুই পাওনাদার প্রতিষ্ঠানের হাজিরার জন্য সমন জারি করেন। পাশাপাশি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেওয়া হয়। আগামী ১৫ নভেম্বর সমন বা প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির কপি দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেউলিয়া মামলা নিয়ে কাজ করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল আমিন বলেন, একশ্রেণির অসাধু ঋণখেলাপি দেউলিয়া আইনের সুযোগের অপব্যবহার করছেন বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করছেন। আবার কেউ আত্মীয়স্বজন কিংবা অন্য ব্যক্তির নামে সম্পদ তৈরি করছেন। পরে প্রকৃত সম্পদের তুলনায় কম সম্পদ দেখিয়ে আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করছেন।
রুহুল আমিন বলেন, দেউলিয়া ঘোষিত হলে সরাসরি কোনো সাজা হয় না। আবেদনকারী যে পরিমাণ সম্পদ দেখান, তা বিক্রি করে ব্যাংক বা অন্যান্য পাওনাদারের পুরো অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব না হলেও দেউলিয়া প্রক্রিয়া চলতে পারে। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তার মতে, দেউলিয়া মামলা গ্রহণের আগে আবেদনকারীর প্রকৃত সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো কোনো সংস্থার মাধ্যমে সম্পদের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে। এতে প্রকৃত ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তি এবং আইনের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হবে।

