রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ইউএনজিএ এড়িয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক, শি জিনপিংয়ের সিদ্ধান্তে কী বার্তা

নিউজ ডেস্ক

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে জড়ো হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। তবে এবারের অধিবেশনে অংশ নেননি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বরং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি।

২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বরের যুক্তরাষ্ট্র সফরে শির পরিবর্তে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, শি প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সফর করলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে নিউইয়র্কে যাওয়া তার সফরসূচিতে তুলনামূলকভাবে সীমিত অতিরিক্ত সময় যোগ করত বলে নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শি জিনপিং ২০১২ সালের শেষ দিকে চীনের শীর্ষ নেতা হওয়ার পর মাত্র একবার সরাসরি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত হয়েছেন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্ক সফরে গিয়ে তিনি সাধারণ পরিষদে সরাসরি ভাষণ দেন। একই সফরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

২০১৫ সালের ওই সফরই যুক্তরাষ্ট্রে শির সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় সফর ছিল। ফলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেও সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

২০২১ সালে শি জিনপিং সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভার্চুয়াল ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই ভাষণে তিনি চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণা করেন। এরপর থেকে তিনি সাধারণ পরিষদের মঞ্চে আর সরাসরি বা ভার্চুয়ালি ভাষণ দেননি।

গত বছর জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও শি অংশ নেননি। দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিকীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রতি দশক পরপর জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও চীনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতির নজির রয়েছে। এ কারণে ২০২৫ সালে জাতিসংঘের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শির অনুপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল বলে নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন বৈশ্বিক বিভিন্ন উদ্যোগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে নিজস্ব বা বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভার্চুয়াল ভাষণে শি ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালে ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণা করা হয় চীনে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে। ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইউএনজিএর প্রায় এক মাস আগে।

চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নিজস্ব ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ (ডব্লিউএআইসিও) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নিয়েছে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে এটিকে আন্তর্জাতিক এআই সহযোগিতা ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় কাজ করার জন্য চীন-সমর্থিত একটি পৃথক কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে অর্থায়ন কমানোর উদ্যোগ নিলেও সেই ঘাটতি পূরণে চীন একই মাত্রায় এগিয়ে আসেনি বলে নিবন্ধটিতে দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘের নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধে চীনের বিলম্বের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় জাতিসংঘের ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানালেও বেইজিং এমন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে চীনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। এর মধ্যে এসসিওর মতো চীন-নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় কাঠামোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি শীর্ষ বৈঠকও রয়েছে।

নিক্কেই এশিয়ার একটি বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে, ইউএনজিএ এড়িয়ে শি জিনপিংয়ের সিদ্ধান্তের একটি উদ্দেশ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে সরাসরি দুই পরাশক্তির সম্পর্ক হিসেবে তুলে ধরা। তবে এটি বিশ্লেষণভিত্তিক ব্যাখ্যা, চীনা সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকলেও বড় শক্তিগুলো অনেক সময় নিজেদের কৌশলগত ও দ্বিপক্ষীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করে। শির এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ইউএনজিএ এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেই দেখছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন