রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

হরমুজ সংকটে কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, চাপে বাংলাদেশসহ এশিয়ার ক্রেতারা

নিউজ ডেস্ক

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপে এলএনজি সরবরাহের ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়েছে কাতার। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নভেম্বরের নির্ধারিত কিছু এলএনজি কার্গো বাতিল হতে পারে। ভারতের অন্তত একজন ক্রেতাকেও একই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। আর ইতালির জ্বালানি কোম্পানি এডিসন জানিয়েছে, তাদের কাতারি এলএনজি সরবরাহ ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে এসব তথ্য জানিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতারএনার্জি চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রেতাদের জানিয়েছে, নির্ধারিত এলএনজি কার্গো বাতিলের সিদ্ধান্ত নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সংশ্লিষ্ট আরও দুটি সূত্রের বরাতে ভারতের অন্তত একজন ক্রেতাকেও একই তথ্য দেওয়ার কথা জানা গেছে। এ বিষয়ে কাতারএনার্জির তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই গ্রাহকদের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করছে কাতারএনার্জি। এরই মধ্যে প্রায় প্রতি মাসেই কিছু নির্ধারিত কার্গো বাতিল বা সরবরাহ স্থগিত করা হয়েছে। আগের ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ নোটিসের মেয়াদও কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে।

চুক্তিগত ব্যবস্থায় ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো কারণে কোনো পক্ষ চুক্তির নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সাময়িকভাবে কিছু দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।

হরমুজে আংশিক সরবরাহ বাড়লেও অনিশ্চয়তা কাটেনি

চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কাতার এলএনজি পরিবহন কিছুটা বাড়াতে সক্ষম হলেও যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তা এখনও অনেক কম। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। গত বছর বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ দিয়ে পরিবহন হয়েছিল।

ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে কাতারের রপ্তানির পাশাপাশি বৈশ্বিক এলএনজি বাজারেও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনো সমঝোতা হয়নি। ইরান জানিয়েছে, প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের শর্ত শিথিল করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

শীতের আগে বাড়তে পারে দামের চাপ

যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতোমধ্যে এলএনজি বাজারে পড়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ায় এলএনজির দাম ২০২২ সালের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।

উত্তর গোলার্ধে শীত মৌসুম সামনে থাকায় পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শীতকালে আবাসিক গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। এ সময় কাতারের মতো বড় সরবরাহকারীর রপ্তানি কমে গেলে বিকল্প উৎসের জন্য ক্রেতাদের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম আরও বাড়ানোর চাপ তৈরি করতে পারে।

এর প্রভাব বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়েও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলো এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।

কাতারের অবকাঠামোতেও ক্ষতির প্রভাব

হরমুজ সংকটের পাশাপাশি কাতারের এলএনজি উৎপাদন অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চে হামলার পর দেশটির প্রধান এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফানে ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর থেকে সেখানে কম সক্ষমতায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

তবে কাতারএনার্জি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর জন্য স্থাপনাটি প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ নৌপথের বাধা দূর হলেও কাতারের এলএনজি সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো এশীয় দেশগুলো কাতারি এলএনজির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ স্থগিত থাকার বিষয়টি তাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

 

সূত্র : ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন