বাসে বসে জানালা দিয়ে আমড়া, শসা কিংবা পেয়ারা মাখা কিনে খাওয়া, পথে হাঁটতে হাঁটতে ঝালমুড়ি বা ভাজাপোড়া খাওয়া—নিত্যদিনের পরিচিত দৃশ্য। অফিসের নিচে আড্ডার সময় চিতই পিঠা, শিঙাড়া কিংবা পুরিও অনেকের পছন্দের খাবার। এসব খাবার পরিবেশনে প্রায়ই ব্যবহার করা হয় সাধারণ কাগজ, পুরোনো বই কিংবা খবরের কাগজের পাতা।
তবে খাবারের সঙ্গে এ ধরনের কাগজের কালি শরীরে প্রবেশ করলে তা কতটা নিরাপদ—এ প্রশ্ন অনেকেরই অজানা।
সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, রাস্তার খাবার বিক্রেতারা বিভিন্ন সময় কাগজের ঠোঙা, সাধারণ কাগজ ও পত্রিকার পাতা ব্যবহার করেন। আমড়া, শসা, আচার, ঝালমুড়ি, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি, ফুচকা, শিঙাড়া, পুরি, জিলাপি, পরোটা কিংবা লুচি পরিবেশনেও এসব কাগজের ব্যবহার দেখা যায়। কখনো কখনো খাবারের অতিরিক্ত তেল শুষে নিতেও কাগজ ব্যবহার করা হয়।
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদের ভাষ্য, কাগজের অপরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এর কালিও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে পানি বা তেলের সংস্পর্শে কাগজ ভিজে গেলে কাগজে থাকা বিভিন্ন উপাদান খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
তিনি জানান, কাগজে ব্যবহৃত কালিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, রং, প্রিজারভেটিভ ও সলভেন্ট থাকতে পারে। কাগজের সঙ্গে খাবারের সরাসরি সংস্পর্শ হলে এসব উপাদান খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
এ ছাড়া পুরোনো বা ব্যবহৃত কাগজে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকার আশঙ্কাও থাকে। সেসব জীবাণু খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে পাকস্থলী ও অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে।
গরম, তেলযুক্ত কিংবা ভেজা খাবার কাগজে রাখলে কাগজের উপাদান খাবারের সঙ্গে মেশার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, পরোটা, পিঁয়াজু, বেগুনিসহ ভাজাপোড়া খাবারের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার।
একইভাবে পানি বা তেলযুক্ত আমড়া, শসা, আচার কিংবা বিভিন্ন মাখা খাবারও কাগজে পরিবেশন করলে কাগজের উপাদান খাবারের সংস্পর্শে আসে।
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, কাগজের কালিতে থাকা কিছু রাসায়নিক দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন সমস্যা, হৃদ্রোগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
একবার-দুবার এ ধরনের কাগজে রাখা খাবার খাওয়ার চেয়ে নিয়মিত ও দীর্ঘদিন কাগজের প্যাকেট বা পত্রিকার পাতায় খাবার গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভাব্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদের মতে, খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে খাদ্য-নিরাপত্তার মান নিশ্চিত এমন উপকরণ ব্যবহার করা উচিত। ফুড-গ্রেড কাগজ, পরিষ্কার সাদা কাগজ বা উপযুক্ত টিস্যু ও পেপার টাওয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে খাবার রাখার জন্য রঙিন বা অনুপযুক্ত টিস্যু ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
কোনো অবস্থাতেই খবরের কাগজ, পুরোনো বই, হাতে লেখা কাগজ বা সাধারণ প্রিন্টিং কাগজে খাবার সরাসরি রাখা উচিত নয়।
এ ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতারা কাগজে পরিবেশন করা খাবার এড়িয়ে চললে বিক্রেতারাও ধীরে ধীরে নিরাপদ প্যাকেট ও খাদ্য-উপযোগী উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন। ফলে দৈনন্দিন খাবারের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও জীবাণুর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব হবে।

