রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জর্জিয়ার পাহাড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী কাঠের মসজিদ

নিউজ ডেস্ক

দক্ষিণ-পশ্চিম জর্জিয়ার তুরস্ক সীমান্তবর্তী স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আদজারা। অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ জর্জিয়ার এই অঞ্চলটি ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কারণে কিছুটা ব্যতিক্রমী। প্রায় চার শতাব্দী আগে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময় আদজারায় ইসলামের বিস্তার ঘটে। এখনো অঞ্চলটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলিম।

পাহাড়ঘেরা আদজারায় ছড়িয়ে আছে ৫০টিরও বেশি ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদ। ১৮১৭ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নির্মিত এসব স্থাপনা স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক মসজিদই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কিছু মসজিদ এখনো সংরক্ষিত এবং নিয়মিত নামাজের জন্য ব্যবহৃত হলেও বেশ কয়েকটি জরুরি সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।

স্থানীয় অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব স্থাপনার অবস্থা শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের সংকট নয়, বরং জর্জিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতির প্রতিফলন।

আদজারার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর অন্যতম গুলেবি মসজিদ। ভবনটির বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট হলেও এর নির্মাণশৈলীর স্বাতন্ত্র্য এখনো নজর কাড়ে। ভেতরের দেয়ালে বিবর্ণ লাল-নীল রং এবং মিম্বরে খোদাই করা সূক্ষ্ম নকশা মসজিদটির পুরোনো কারুকার্যের সাক্ষ্য বহন করছে।

তরুণ অধিকারকর্মী লিয়া দেকানাদজে বলেন, তার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—নিজের জীবদ্দশাতেই হয়তো গুলেবি মসজিদ হারিয়ে যেতে দেখবেন তিনি।

প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রথম মসজিদটি দেখতে গিয়েছিলেন দেকানাদজে। তার ভাষ্য, এত অল্প সময়ের মধ্যেই স্থাপনাটির দৃশ্যমান অবনতি ঘটেছে। একসময় উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের দরজাটিও এখন বৃষ্টি, তুষার ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় বিবর্ণ হয়ে গেছে।

খুলো শহরে নিজের কার্যালয়ে স্থানীয় মুফতি আসলান আবাশিদজে বলেন, উসমানীয় শাসনামলে এসব মসজিদ স্থানীয় জনগণের অর্থ ও সম্পদ দিয়েই নির্মিত হয়েছিল। পাহাড়ি এলাকায় সহজলভ্য কাঠ ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় মসজিদগুলোর স্থাপত্যে স্থানীয় কাঠের বাড়ির বৈশিষ্ট্যও ফুটে উঠেছে।

ফলে এগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, আদজারার নিজস্ব স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

সোভিয়েত শাসনের শুরুর দিকে আদজারায় মসজিদ নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩০-এর দশকে ধর্মের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অভিযান জোরদার হলে অনেক ধর্মীয় স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েকটি মসজিদের মিনারও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল।

মুফতি আবাশিদজের ভাষ্য, সে সময় কিছু মসজিদ দোকান কিংবা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এতে অভ্যন্তরীণ নকশার কিছু অংশ নষ্ট হলেও স্থাপনাগুলো ব্যবহারযোগ্য থাকায় মূল কাঠামোর অনেকটাই টিকে যায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েকটি মসজিদে আবার ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্যে খুলো এলাকার ঘোরজোমি মসজিদ স্থানীয় মুসলিমদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। যত্নে রাখা এই মসজিদের অভ্যন্তরে এখনো নানা রঙের অলংকরণ দেখা যায়।

তবে সোভিয়েত আমলের দমন-পীড়ন থেকে টিকে যাওয়া অনেক মসজিদ এখন নতুন সংকটে পড়েছে—অবহেলা, জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং সংস্কারের অর্থের অভাবে।

গবেষক জিওর্গি রিঝভাদজে বলেন, ঐতিহাসিক এসব মসজিদ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

কাঠের তৈরি হওয়ায় স্থাপনাগুলো আবহাওয়ার প্রভাবে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আদজারার তুষারময় শীত এবং আর্দ্র গ্রীষ্ম কাঠের কাঠামোতে ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়। অনেক মসজিদের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও পুরোনো হয়ে যাওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

গত বছর আগুনে দুটি মসজিদ ধ্বংস হয়। আগুনের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অন্তত একটি মসজিদের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংস্কারের ব্যয়ও কম নয়। পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র ও ছোট জনগোষ্ঠীর পক্ষে এসব ব্যয় বহন করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। পাশাপাশি পাহাড়ধস, সীমিত কর্মসংস্থান ও জীবিকার সংকটে অনেক মানুষ অঞ্চল ছেড়ে আঞ্চলিক রাজধানী বাতুমিতে চলে যাচ্ছেন। এতে গ্রামগুলোতে জনসংখ্যা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা—দুটিই কমছে।

গত বছর আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাতিসখুরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আরও দুটি মসজিদের সংস্কারকাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। তবে রিঝভাদজে ও দেকানাদজের অভিযোগ, সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় ধীরগতির।

মহামারির সময় রিঝভাদজে, দেকানাদজেসহ একদল তরুণ মিলে ‘সলিডারিটি কমিউনিটি’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনটি আদজারার ইসলামী ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্থাপনার মানচিত্র তৈরি, মসজিদগুলোর অবস্থা যাচাই এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার কাজ শুরু করে।

রিঝভাদজে বলেন, তাদের উদ্যোগের আগে আদজারার এসব ঐতিহাসিক মসজিদ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা বা গবেষণা ছিল না। রাজধানী তিবিলিসিতে বসবাসকারী অনেক মানুষই এ অঞ্চলের অনন্য স্থাপত্য ঐতিহ্য সম্পর্কে খুব কম জানতেন।

তাদের কাজের আরেকটি লক্ষ্য ছিল জর্জিয়ার জাতীয় ইতিহাসের বয়ানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবদানকে আরও দৃশ্যমান করা।

দেকানাদজের মতে, জর্জিয়ায় ইসলামকে অনেক সময় ‘বিদেশি’ হিসেবে দেখানো হয়। মুসলিম পরিচয়কে আজারবাইজান বা চেচনিয়া থেকে আসা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা রয়েছে। এতে জর্জিয়ান মুসলিমদের দীর্ঘ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অবদান আড়ালে পড়ে যায়।

তার দাবি, দেশটির একটি ছোট কিন্তু সোচ্চার উগ্র জাতীয়তাবাদী অংশ এমন বয়ানও প্রচার করে, যেখানে একই সঙ্গে মুসলিম ও জর্জিয়ান হওয়া সম্ভব কি না—সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

রিঝভাদজে মনে করেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও জর্জিয়ান মুসলিমদের ইতিহাস ও অবদান যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তার ভাষ্য, সংবিধানে ধর্মীয় বহুত্ববাদ স্বীকৃত থাকলেও মুসলিম ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারের সম্পৃক্ততা এখনো সীমিত।

আদজারার আঞ্চলিক রাজধানী এবং জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বাতুমিতেও মুসলিমদের ধর্মীয় অবকাঠামোর সংকট রয়েছে। শহরে মাত্র একটি মসজিদ থাকায় মুসল্লিদের একটি অংশকে প্রায়ই রাস্তায় নামাজ আদায় করতে হয়।

তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য হওয়ায় বাতুমিতে নতুন মসজিদের প্রয়োজন আরও বেড়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জর্জিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নাগরিক সংগঠনগুলোর কাজকে কঠিন করে তুলেছে। বিদেশি অর্থায়ন গ্রহণকারী সংগঠনগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের লক্ষ্যে করা ‘ফরেন এজেন্ট’ আইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। সরকারের দাবি, এসব আইন জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অধিকার সংগঠনগুলো এর সমালোচনা করেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদেশি অর্থায়ন ও সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে বাড়তি বিধিনিষেধের কারণে ‘সলিডারিটি কমিউনিটি’ও তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। ফলে আদজারার পাহাড়ি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় উদ্যোগ থমকে গেছে।

গুলেবি মসজিদ থেকে নিচের দিকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় দেকানাদজে বলেন, তাদের উদ্যোগের কারণে এসব মসজিদ কিছু সময়ের জন্য জনপরিসরের আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু দেশের চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় এখন সেগুলো নিয়ে আলোচনা প্রায় বন্ধ।

তার আশঙ্কা, দীর্ঘদিন নজরের বাইরে থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা ভুলে যাবে।

গুলেবি মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। গ্রামটির অধিকাংশ বাসিন্দাও বর্তমানে খ্রিস্টান। তবে দেকানাদজের মতে, একটি স্থাপনা বর্তমানে ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিই সংরক্ষণের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।

তার ভাষায়, এসব মসজিদ স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পুরো জর্জিয়ার ইতিহাসের অংশ। এগুলোতে শুধু ইবাদতের ইতিহাস নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত শ্রম, সামাজিক যোগাযোগ ও স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে।

দেকানাদজে বলেন, এসব মসজিদ তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ শুধু মুসলিম ঐতিহ্য হিসেবে নয়; এগুলো মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার নিদর্শন। তাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এগুলোর প্রতি অবহেলা তাকে উদ্বিগ্ন করে।

সরাসরি দমন-পীড়নের সময় হয়তো অতীত হয়েছে, কিন্তু সংরক্ষণের অভাবও ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে অর্থ, জনবল ও উদ্যোগের সংকট বাড়তে থাকলে আদজারার শতবর্ষী কাঠের মসজিদগুলোর অনেকগুলোই হয়তো ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন