রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

এলএনজি সংকটে বিশ্ব, শীতেই বাড়তে পারে গ্যাসের দাম

নিউজ ডেস্ক

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সরবরাহ সংকটে পড়েছে বিশ্ববাজার। কাতার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে এশিয়ার বাজারে এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামনে শীত মৌসুমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে জ্বালানি কেনার প্রতিযোগিতা বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইউরোপ কাতারের এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত মার্চে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। এরপর কাতার চুক্তিবদ্ধ ক্রেতাদের জানায়, চুক্তি অনুযায়ী সব এলএনজি সরবরাহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

এরপর থেকে কাতার মাত্র ৯৮টি এলএনজি কার্গো পাঠিয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৫৩৬টি কার্গো কম। ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন, যা গত বছর বিশ্বব্যাপী সরবরাহ করা মোট এলএনজির প্রায় ৯ শতাংশ।

সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দামের ওপরও। এশিয়ায় বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম প্রায় ২৫ ডলার। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে প্রায় ১৪০ শতাংশ।

শীতের আগে ইউরোপে বাড়ছে উদ্বেগ

এলএনজি সংকটের বড় পরীক্ষা হতে পারে আসন্ন শীত। সাধারণত ইউরোপ গ্রীষ্মকালে শীতের চাহিদা মোকাবিলায় গ্যাসের মজুত বাড়িয়ে রাখে। কিন্তু এবার এশিয়ার দেশগুলো আটলান্টিক অঞ্চল থেকে আসা অনেক এলএনজি কার্গো কিনে নেওয়ায় ইউরোপের মজুত প্রত্যাশার তুলনায় কম রয়েছে।

বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুত প্রায় ৭২ শতাংশ পূর্ণ। বছরের এই সময়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের গড় মজুত ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ এবার ইউরোপের মজুত স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

জার্মানির পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির গ্যাস মজুত প্রায় ৫৭ শতাংশ পূর্ণ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বর মাসে আবহাওয়া প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ঠান্ডা হলে ইউরোপকে দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কিনতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শীত আরও তীব্র হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে গেলে গ্যাসের দামের ওপর কোনো নির্দিষ্ট সীমা নাও থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সিঙ্গাপুরের এক সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তা।

কাতারের সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে

কাতার এখনো তাদের এলএনজি উৎপাদন ও তরলীকরণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি চালু করতে পারেনি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে দোহা এখনো নিশ্চিত নয়।

কাতারের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী বছরের শীতের আগে ইউরোপকে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি সংগ্রহ করতে হতে পারে। এতে ২০২৭ সালজুড়েও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের ওপর বাড়তি চাপ থাকতে পারে।

সংকটের পরই আসতে পারে অতিরিক্ত সরবরাহ

বর্তমান সংকটের বিপরীতে এলএনজি বাজারে আগামী কয়েক বছরে আরেক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন নতুন প্রকল্প চালু হলে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেড়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে। কানাডাতেও সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। পাশাপাশি আর্জেন্টিনা ও সেনেগালের মতো দেশগুলোতেও নতুন এলএনজি প্রকল্প এগিয়ে চলছে। ছোট ও মডুলার তরলীকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় এসব দেশ থেকে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

নতুন প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বছরে এলএনজি সরবরাহ ৬৩ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। গত বছরের তুলনায় যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে চাহিদা একই গতিতে বাড়বে না বলে পূর্বাভাস রয়েছে। রিস্ট্যাড এনার্জির হিসাবে, দশকের শেষ দিকে বিশ্বে এলএনজির বার্ষিক চাহিদা দাঁড়াতে পারে ৫৭ কোটি ৪০ লাখ টনে।

এলএনজির দামে ধসের আশঙ্কাও

কাতার পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ শুরু করলে এবং পরিকল্পিত নতুন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এলএনজি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ৫ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ টনের ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৬ ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বর্তমানের সরবরাহ সংকট কয়েক বছর পর উল্টো অতিরিক্ত সরবরাহের সংকটে রূপ নিতে পারে।

এই অনিশ্চয়তার কারণে বড় ক্রেতা ও বিক্রেতারা বাজারে বাড়তি নমনীয়তা তৈরির চেষ্টা করছে। কেউ গ্যাস মজুত করছে, কেউ রিগ্যাসিফিকেশন সুবিধা কিনছে, আবার কেউ নিজস্ব এলএনজি ট্রেডিং ব্যবসা গড়ে তুলছে।

ফলে আগামী কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে দামের বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দিতে পারে। বর্তমান সরবরাহ সংকট সাময়িকভাবে জ্বালানি ব্যয় বাড়ালেও এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারকে দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল রাখতে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন