সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উত্তেজনার মধ্যেই দেশটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের আলোচনা সামনে এসেছে। বর্তমান চার প্রদেশকে ভেঙে আরও ছোট কয়েকটি প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর নেপথ্যে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূমিকা রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো প্রদেশে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইমরানকে ঘিরে উত্তেজনা
ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) কর্মী-সমর্থকদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। কারাগারে থাকা ইমরান খানকে সমর্থন জানাতে ইসলামাবাদমুখী মিছিলের ঘোষণা দিয়েছিল দলটি।
বিক্ষোভ ঠেকাতে সরকার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যেই ৪ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখাওয়ার লাক্কি মারওয়াত থেকে প্রায় পাঁচ হাজার সমর্থক মিছিল শুরু করেন। পথে আরও লোকজনকে সঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই সামনে এসেছে দেশের প্রশাসনিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের আলোচনা।
কেন প্রদেশ ভাঙার আলোচনা
প্রস্তাবটির সমর্থকেরা মনে করছেন, পাকিস্তানের বর্তমান প্রদেশগুলো আয়তন ও জনসংখ্যায় অনেক বড় হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট প্রদেশ গঠন করা হলে স্থানীয় প্রশাসন আরও কার্যকর হবে এবং সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছানো সহজ হতে পারে।
তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বরং পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ধরে রাখা রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতা কমানোও এর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
পাঞ্জাব-সিন্ধুতেই বড় বাধা
পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাব। দেশটির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রদেশে শরীফ পরিবারের প্রভাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এ পরিবারের সদস্য। তার ভাই নওয়াজ শরীফও একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ।
অন্যদিকে সিন্ধুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ভুট্টো পরিবার। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) মাধ্যমে পরিবারটির শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত এবং তার ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে দেখা হয়।
ফলে প্রদেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ এই দুই রাজনৈতিক শক্তির জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
প্রদেশ পুনর্গঠনের আলোচনায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত দুই বছরে দেশটির সংবিধানে একাধিক পরিবর্তন এবং নতুন ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব আরও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও সেনাবাহিনীর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল বলে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগকে কেউ কেউ বেসামরিক প্রশাসনকে পুনর্গঠনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে এটিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
অর্থনৈতিক সংকটও বড় বাস্তবতা
পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছায়। ঋণ পরিশোধ ও সরকারি ব্যয়ের চাপের কারণে উন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতাও সীমিত।
জ্বালানি ও করের চাপ নিয়েও জনগণের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তান কিছু সাফল্য পেলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও প্রশাসনকে স্থিতিশীল করতে বেসামরিক নেতৃত্ব আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বাস্তবায়ন সহজ নয়
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী কোনো প্রদেশ ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ফলে চার প্রদেশকে ভেঙে নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন হবে।
পাঞ্জাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান এক ধরনের হলেও সিন্ধুতে পিপিপির বিরোধিতা বড় বাধা হতে পারে। এরই মধ্যে সিন্ধু বিধানসভা প্রদেশ ভাগের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব পাস করেছে।
ইমরান খানও বড় ফ্যাক্টর
প্রদেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগের পাশাপাশি ইমরান খানের জনপ্রিয়তাও পাকিস্তানের ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারাগারে থেকেও তিনি পিটিআইয়ের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ধরে রেখেছেন। তার মুক্তির দাবিতে সমর্থকদের নিয়মিত কর্মসূচিও চলছে।
এ অবস্থায় প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন বা ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নতুন রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের প্রদেশ পুনর্গঠনের আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। পরিকল্পনাটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমর্থন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর। তবে এই বিতর্ক ইতোমধ্যেই পাকিস্তানে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক রাজনীতির সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

