বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় দেশে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এর অক্টোবর ২০২৬ সংস্করণে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ব্যাংক খাত, জ্বালানি, রাজস্ব ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে, যা করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে সর্বনিম্ন।
বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে ধাক্কা
প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম প্রধান কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প অনুমোদনে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতিতে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।
খেলাপি ঋণে নাজুক ব্যাংক খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এ হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে যায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মান ১০ শতাংশ।
চলতি বছরের জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারের উচ্চ ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত করে বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে।
বাড়ছে দারিদ্র্য, চাপে সাধারণ মানুষের জীবন
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মডেল অনুযায়ী, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে নতুন প্রায় ২১ লাখ মানুষ।
গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যায় জীবনযাত্রার ব্যয় উঁচুতে রয়েছে। আগস্টে কম আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে যাওয়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত দরিদ্রদের একটি অংশ এর বাইরে থাকছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানি সংকটে শিল্প ও কর্মসংস্থান
গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতায় শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ শতাংশে নেমেছে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা মহামারির পর এ খাতে প্রথম সংকোচন।
জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানা উৎপাদন কমানো, কর্মঘণ্টা হ্রাস কিংবা কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে গেছে। অর্থনীতির স্থবিরতার প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়েছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারিয়ে অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন।
রেমিট্যান্সে রেকর্ড, কমেছে এফডিআই
অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে প্রবাসী আয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে একই সময়ে নিট বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিনিময় হারও মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। গত অর্থবছরে প্রতি ডলারের গড় আন্তব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ১০ পয়সা। আগস্টে তা প্রায় ১২২ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়।
রাজস্ব ঘাটতি, বাড়ছে ব্যাংকনির্ভরতা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। তবে সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বাড়ানোর পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এদিকে সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির ১১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। চলতি ব্যয় বেড়েছে, বিপরীতে মূলধনি ব্যয় কমেছে।
বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, যেখানে আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমিয়ে সুদহার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী দুই বছরেও প্রবৃদ্ধি থাকবে দুর্বল
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশেই থাকতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা থাকলেও তা দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছে সংস্থাটি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ১ শতাংশ থাকতে পারে।
সংস্কারে তিন খাতে জোর বিশ্বব্যাংকের
অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি ফেরাতে তিনটি প্রধান খাতে দ্রুত সংস্কারের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
ব্যাংক খাত: দ্রুত সম্পদের মান পর্যালোচনা, দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা, মালিকদের লোকসানের দায় বহন নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রক ছাড় তুলে নেওয়া।
জ্বালানি খাত: দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিদ্যুৎ কেনায় স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা।
রাজস্ব খাত: করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করা, কর ফাঁকি রোধ এবং ঢালাও করছাড় কমিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো।
পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

