রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

নিউমোনিক প্লেগ কী? কতটা ভয়ের কারণ হতে পারে এই রোগ?

নিউজ ডেস্ক

সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাগারে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী এক গবেষকের নিউমোনিয়ায় মৃত্যু ঘিরে নিউমোনিক প্লেগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখনো তার মৃত্যুর সঙ্গে প্লেগ বা গবেষণাগারে ব্যবহৃত কোনো জীবাণুর সম্পর্কের প্রমাণ পায়নি।

ঘটনাটি ঘটেছে রাশিয়ার ইরকুতস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। গবেষক দারিয়া শিপিলোভা ২ অক্টোবর নিউমোনিয়ার কারণে মারা যান। তার অসুস্থতার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের একটি অংশকে পর্যবেক্ষণ ও কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল। প্রায় ৫ হাজার পরীক্ষার পরও প্লেগের সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি বলে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

রাশিয়ার সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা রসপোট্রেবনাডজর জানিয়েছে, ওই গবেষকের অসুস্থতার সঙ্গে গবেষণাগারে ব্যবহৃত জীবাণুর কোনো সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, গবেষণাগারে জীবাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রটোকল মেনে চলা হয়েছিল।

ঘটনাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি অত্যন্ত কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মৃত্যুর কারণ, চলমান পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।

নিউমোনিক প্লেগ কী?

নিউমোনিক প্লেগ হলো Yersinia pestis ব্যাকটেরিয়াজনিত প্লেগের সবচেয়ে গুরুতর রূপগুলোর একটি। সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের নিঃসৃত কণা অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করলে এটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্লেগের প্রধান তিনটি রূপ হলো বুবোনিক, সেপটিসেমিক ও নিউমোনিক প্লেগ। বুবোনিক প্লেগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এতে লসিকাগ্রন্থি ফুলে গিয়ে তীব্র ব্যথা হতে পারে। সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়লে সেপটিসেমিক প্লেগ এবং ফুসফুসে পৌঁছালে নিউমোনিক প্লেগ হতে পারে।

নিউমোনিক প্লেগের লক্ষণ খুব দ্রুত দেখা দিতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও কাশি এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসা না হলে রোগটি দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উপসর্গ শুরুর ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু ঘটতে পারে।

তবে দ্রুত শনাক্ত করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগী সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সিডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, প্লেগের সন্দেহ হলে পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত উপযুক্ত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল চিকিৎসা শুরু করা উচিত। চিকিৎসায় সিপ্রোফ্লক্সাসিন, লেভোফ্লক্সাসিন, মক্সিফ্লক্সাসিন, জেন্টামাইসিনসহ বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

কেন এখনো প্লেগের অস্তিত্ব রয়েছে?

ঐতিহাসিকভাবে প্লেগ ভয়াবহ মহামারির কারণ হলেও আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে বর্তমানে এটি চিকিৎসাযোগ্য। তবে Yersinia pestis ব্যাকটেরিয়া প্রকৃতিতে এখনও রয়েছে এবং সাধারণত ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও তাদের শরীরে থাকা মাছির মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানবিক প্লেগের ঘটনা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও মাদাগাস্কারে রিপোর্ট হয়েছে।

প্লেগের টিকা সাধারণ জনগণের জন্য নিয়মিতভাবে সুপারিশ করে না ডব্লিউএইচও। তবে গবেষণাগারের কর্মী বা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে টিকা বিবেচনা করা যেতে পারে।

রাশিয়ার ঘটনায় ঝুঁকি কতটা?

বর্তমানে রাশিয়ার ওই গবেষকের মৃত্যুকে নিউমোনিক প্লেগের ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি। বরং রুশ কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত প্লেগ শনাক্ত হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিও পরিস্থিতি থেকে দেশটির জন্য ঝুঁকি অত্যন্ত কম বলে জানিয়েছে।

তবে গবেষণাগারটি প্লেগসহ বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে কাজ করায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি নজর কেড়েছে। ডব্লিউএইচও বলেছে, পরিস্থিতির পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে ঝুঁকির মূল্যায়নও পরিবর্তন করা হতে পারে।

নিউমোনিক প্লেগ নিশ্চিত হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আইসোলেশনে রাখা এবং ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদেরও যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে বলা হয়।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন