নতুন আইফোন ১৮ প্রোতে ক্যামেরা, প্রসেসর, ব্যাটারি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সুবিধায় বেশ কিছু উন্নতি এনেছে অ্যাপল। বিশেষ করে ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচারযুক্ত ৪৮ মেগাপিক্সেলের প্রধান ক্যামেরা এবং নতুন এ২০ প্রো চিপ ফোনটিকে আগের প্রজন্মের তুলনায় আরও শক্তিশালী করেছে। তবে আইফোন ১৭ প্রো থেকে নকশাগত পরিবর্তন খুব সীমিত হওয়ায় সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে বড় ধরনের পরিবর্তন বলা কঠিন। বিভিন্ন পর্যালোচনাতেও এটিকে মূলত পরিমার্জিত বা ধাপে ধাপে উন্নত সংস্করণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
নকশায় বড় পরিবর্তন নেই
গত বছর আইফোন ১৭ প্রো সিরিজে নকশায় বড় পরিবর্তন এনেছিল অ্যাপল। ফলে আইফোন ১৮ প্রোতে বাহ্যিক পরিবর্তন তুলনামূলক কম। ফোনটি কিছুটা ভারী হলেও অ্যালুমিনিয়াম বডি, পেছনের গ্লাস ও ক্যামেরা মডিউলের সামগ্রিক বিন্যাস আগের প্রজন্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
তবে নতুন রঙ এবং পরিমার্জিত নির্মাণ ফোনটিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। অ্যাপল এবার চারটি রঙে আইফোন ১৮ প্রো এনেছে—বারগান্ডি, গ্লেসিয়ার, সিলভার ও ব্ল্যাক।
উন্নত ডিসপ্লে ও ছোট ডায়নামিক আইল্যান্ড
আইফোন ১৮ প্রোতে রয়েছে ৬.৩ ইঞ্চির সুপার রেটিনা এক্সডিআর ওএলইডি ডিসপ্লে এবং ১২০ হার্টজ প্রোমোশন। ডিসপ্লের উজ্জ্বলতা ও স্বচ্ছতা আগের মতোই উন্নতমানের, তবে নতুন অ্যান্টি-রিফ্লেকটিভ আবরণ উজ্জ্বল পরিবেশে ব্যবহারকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক করেছে।
ফেস আইডি ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত অংশও কিছুটা ছোট করা হয়েছে। এর ফলে ডায়নামিক আইল্যান্ডে আগের তুলনায় বেশি তথ্য একসঙ্গে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ২০ প্রো চিপে বাড়তি গতি
আইফোন ১৮ প্রোতে ব্যবহার করা হয়েছে এ২০ প্রো চিপ, যা ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম স্মার্টফোন চিপগুলোর একটি। এতে ৬-কোর সিপিইউ, ৭-কোর জিপিইউ এবং ডুয়াল ১৬-কোর নিউরাল ইঞ্জিন রয়েছে।
অ্যাপলের নতুন ভ্যাপার-চেম্বার কুলিং ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘ সময় গেমিং বা ভারী কাজের সময়ও পারফরম্যান্স ধরে রাখার সক্ষমতা বেড়েছে। অ্যাপলের দাবি, নতুন তাপ ব্যবস্থাপনায় টেকসই পারফরম্যান্স আগের প্রজন্মের তুলনায় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
দৈনন্দিন ব্যবহারে অবশ্য এই অতিরিক্ত ক্ষমতার পার্থক্য সব সময় চোখে পড়বে না। তবে গেমিং, ভিডিও সম্পাদনা ও অন্যান্য ভারী কাজে এর সুবিধা বেশি বোঝা যাবে।
ব্যাটারিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের অন্যতম বড় উন্নতি ব্যাটারি। অ্যাপলের হিসাবে, আইফোন ১৮ প্রোতে সর্বোচ্চ ৩৬ ঘণ্টা ভিডিও প্লেব্যাক পাওয়া যেতে পারে। দ্রুত চার্জিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১৫ মিনিটে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করা সম্ভব।
বাস্তব ব্যবহারের পরীক্ষাতেও ব্যাটারি পারফরম্যান্স ভালো পাওয়া গেছে। তবে ঠিক কতক্ষণ ব্যাকআপ পাওয়া যাবে, তা ব্যবহার, নেটওয়ার্ক, উজ্জ্বলতা ও অ্যাপ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে।
ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার ক্যামেরায় নতুনত্ব
আইফোন ১৮ প্রোর ক্যামেরা ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার। ৪৮ মেগাপিক্সেলের প্রধান ক্যামেরায় এফ/১.৪৮, এফ/১.৮, এফ/২.৮ ও এফ/৪.০—বিভিন্ন অ্যাপারচার বেছে নেওয়া যায়।
কম আলোতে বড় অ্যাপারচার বেশি আলো গ্রহণ করতে পারে, ফলে দ্রুত নাইট মোড ছবি তোলার সুবিধা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ছোট অ্যাপারচার ব্যবহার করলে ছবিতে বেশি গভীরতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। ব্যবহারকারী চাইলে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপারচার নির্ধারণ করতে দিতে পারেন, আবার প্রো কন্ট্রোল ব্যবহার করে নিজেও সেটিং পরিবর্তন করতে পারেন।
পেছনে তিনটি ৪৮ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা রয়েছে—প্রধান, আল্ট্রাওয়াইড এবং ৪এক্স টেলিফটো। টেলিফটো ক্যামেরার মাধ্যমে অপটিক্যাল-মানের ৮এক্স পর্যন্ত জুম সুবিধাও পাওয়া যায়।
নতুন সিরি ও অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স
আইওএস ২৭-এর সঙ্গে আইফোন ১৮ প্রোতে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের নতুন সুবিধা এবং উন্নত সিরি যুক্ত হয়েছে। সিরি আগের তুলনায় ব্যবহারকারীর প্রসঙ্গ ও অনুরোধ বুঝে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
স্ক্রিনে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করা, অ্যাপের মধ্যে তথ্য ব্যবহার এবং বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবে কিছু সুবিধা এখনো অ্যাপলের নিজস্ব ইকোসিস্টেমের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে থার্ড-পার্টি অ্যাপের ক্ষেত্রে সব এআই সুবিধা সমানভাবে পাওয়া যায় না।
কার জন্য আইফোন ১৮ প্রো?
আইফোন ১৭ প্রো ব্যবহারকারীর জন্য আইফোন ১৮ প্রোতে আপগ্রেড করার প্রধান কারণ হতে পারে উন্নত ব্যাটারি, এ২০ প্রো চিপ এবং ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার ক্যামেরা। বিশেষ করে যারা মোবাইলে নিয়মিত ছবি তোলেন, ভিডিও করেন বা ভারী গেম খেলেন, তাদের জন্য নতুন ফিচারগুলোর ব্যবহারিক সুবিধা বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে আইফোন ১৭ প্রো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় পার্থক্য খুব বড় নাও হতে পারে। বিভিন্ন পর্যালোচনাতেও ১৮ প্রোকে ১৭ প্রোর তুলনায় বড় পরিবর্তনের বদলে পরিমার্জিত আপগ্রেড হিসেবে দেখা হয়েছে।
এক নজরে ভালো-মন্দ
ভালো দিক: উন্নত ক্যামেরা, ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার, শক্তিশালী এ২০ প্রো চিপ, দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ, উন্নত কুলিং ব্যবস্থা, চমৎকার ডিসপ্লে এবং উন্নত এআই সুবিধা।
মন্দ দিক: নকশায় বড় পরিবর্তন নেই, আগের প্রজন্মের তুলনায় দাম বেশি এবং ১৭ প্রো থেকে আপগ্রেড করলে দৈনন্দিন ব্যবহারে পার্থক্য সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নাও হতে পারে।
বাংলাদেশে দাম
বাংলাদেশের বাজারে আইফোন ১৮ প্রোর দাম স্টোরেজ, আমদানিকারক, ওয়ারেন্টি ও বিক্রেতাভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট বাজারদর উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার বর্তমান মূল্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, আইফোন ১৮ প্রো অ্যাপলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও পরিণত প্রো মডেলগুলোর একটি। তবে এটি মূলত ক্যামেরা, ব্যাটারি ও পারফরম্যান্সে উন্নতি আনা একটি পরিমার্জিত সংস্করণ—আইফোন ১৭ প্রো থেকে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতার ফোন নয়।

