সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

খাল খননের পর বহুমুখী ব্যবহার, আসছে ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি

নিউজ ডেস্ক

দেশের আট বিভাগে ২০টি সরকারি খালকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মডেল খাল’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পুনঃখননের পর এসব খালকে পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি মাছ ও হাঁস চাষ, সামাজিক বনায়ন, মৌসুমি সবজি উৎপাদন এবং দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রাথমিকভাবে এ কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আগামী ১৯ নভেম্বর লালমনিরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচিটি উদ্বোধন করবেন বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তৈরি ধারণাপত্রে এ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

‘শুধু খাল খনন নয়; খননকৃত খালের বহুমুখী ব্যবহার’—এই ধারণাকে সামনে রেখে কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য সরকারি জলসম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ-সহনশীল জীবিকা গড়ে তোলা এবং অতিদরিদ্র মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কার্যক্রম চলছে। চারটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এ কর্মসূচির আওতায় তাঁর মন্ত্রণালয় ৭ হাজার কিলোমিটার খননের দায়িত্ব পালন করবে। গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার খননকাজ শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ, মাছ ও হাঁস চাষ এবং কুটিরশিল্পের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে খালগুলোকে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চায় সরকার।

কেন ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি

মন্ত্রণালয়ের ধারণাপত্র অনুযায়ী, পুনঃখননের পর নিয়মিত তদারকি ও সমন্বিত ব্যবহার না থাকলে খাল আবারও অবৈধ দখল, আবর্জনা ও পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ পরিস্থিতি ঠেকিয়ে খালগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে পরিণত করাই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে মাছ চাষ, নিয়ন্ত্রিত হাঁস পালন, সামাজিক বনায়ন এবং মৌসুমি সবজি উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি উপযোগী খালে নৌচলাচল ও জনসাধারণের বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা হলো, দরিদ্র পরিবারগুলো খালকেন্দ্রিক উৎপাদন ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হবে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা শুধু ভাতা বা আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদনশীল জীবিকার পথ তৈরি করবে।

আট বিভাগে ২০ খাল, উপকারভোগী নির্বাচন

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে তিনটি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি করে খাল নির্বাচন করা হবে। প্রতিটি খালের গড় দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার ধরে মোট প্রায় ৬০ কিলোমিটার খালকে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে আগে পুনঃখনন করা হয়েছে—এমন খাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচিত হবে না। জেলা পর্যায়ে পাওয়া প্রস্তাবগুলো থেকে জিপিএস স্থানাঙ্ক, জমির খতিয়ান, দখল পরিস্থিতি, পানিপ্রবাহ ও স্থানীয় চাষাবাদের উপযোগিতা যাচাই করে চূড়ান্ত খাল নির্বাচন করা হবে।

উপকারভোগী হিসেবে স্থানীয় অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি), নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন এমন দরিদ্র পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে তাঁদের নির্বাচন করা হবে।

খালের কোন অংশে কী হবে

খালের পরিবেশ ও স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে এলাকাভিত্তিক ব্যবহার নির্ধারণ করা হবে। নির্দিষ্ট অংশ জনসাধারণের পানি সংগ্রহ, গোসল ও অন্যান্য বৈধ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। উপযোগী অংশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে মাছ চাষ ও নিয়ন্ত্রিত হাঁস পালনের ব্যবস্থা করা হবে।

যেসব খালে নৌযান চলাচলের সুযোগ রয়েছে, সেখানে নৌচলাচলের পথ অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। খালের দুই পাড়ে মাটি ধসে পড়া রোধে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছ লাগানো এবং ঢালু অংশে মাচা পদ্ধতিতে মৌসুমি সবজি চাষের সুযোগও রাখা হবে।

সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় কর্মসংস্থান

প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে স্থানীয় সমবায়ের মাধ্যমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সমবায়ের সদস্যদের অন্তত ৫০ শতাংশ নারী রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে কোনো ব্যক্তি বা সমবায়কে খাল, খালপাড়ের জমি কিংবা সরকারি অবকাঠামোর ওপর স্থায়ী মালিকানা দেওয়া হবে না। আইনগতভাবে অনুমোদিত ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ ও হস্তান্তর-অযোগ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, খালপাড়ের দরিদ্র মানুষ এসব কর্মকাণ্ড থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হলে তাঁরা নিজেরাই খাল পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণে আগ্রহী হবেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হবে।

প্রাথমিক বিনিয়োগ সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা

ধারণাপত্রে কর্মসূচির প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ অর্থ স্থায়ী অনুদান বা দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি হিসেবে নয়, ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন শুরু হলে আয় থেকে সমবায়গুলো নিজেদের পরিচালন ব্যয় মেটাবে।

নতুন কোনো বৃহৎ প্রকল্পের পরিবর্তে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি দায়িত্বও বহাল থাকবে।

জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ১২ মাস পরিচালনার পর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কর্মসূচিটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, কর্মসূচির প্রথম দুই বছর সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ, উৎপাদন উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেবে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন, আয় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সমবায়ভুক্ত স্থানীয়দের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন