রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো ও যানজট কমাতে ছয় মাসের মধ্যে ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসসেবা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দুটি রুটে এ সেবা চালুর সিদ্ধান্তও হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বাস রুট পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্টপেজ, বাসের মান উন্নয়ন এবং চালকদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে ৩২টি রুটের ফ্র্যাঞ্চাইজি চূড়ান্ত করা হবে। এ সময়ের মধ্যে বাসের স্টপেজ নির্ধারণ এবং জরাজীর্ণ বাস মেরামত, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রং করার কাজও সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানোন্নয়ন না করা বাস চলাচল থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় কাউন্টারভিত্তিক যাত্রীসেবা, ই-টিকিটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যা, পরিচালনাকারী কোম্পানি, কাউন্টার, ডিপো ও বাস রাখার নির্ধারিত স্থান চিহ্নিত করা হবে। বাসের ফিটনেস, শৃঙ্খলা ও আইন মেনে চলার দায়িত্বও থাকবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাস মালিক সমিতিকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে ৯৮টি চালু রয়েছে। এসব রুটে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস চলাচল করছে। বিদ্যমান রুটগুলো পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজধানীতে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচলের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যাত্রী ওঠানো-নামানো নিয়ে বিশৃঙ্খলা এবং যানজটের সমস্যা রয়েছে। এ পরিস্থিতি বদলাতে একটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে তৎকালীন সরকার এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কমিটি গঠন করে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চালু করা হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্স-সিলভা ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) যৌথভাবে এ সেবা পরিচালনা করে। এতে কাউন্টারভিত্তিক ই-টিকিটিং ব্যবস্থা ছিল। যাত্রীরা নির্ধারিত স্টপেজ থেকে টিকিট নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নামতে পারতেন।
তবে ওই রুটে অন্য কোম্পানির বাসগুলোকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব না হওয়ায় পরীক্ষামূলক সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রী ছাউনিগুলোও পরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বাস মালিকদের পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার নতুন করে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে সরকার।
ডিটিসিএ ইতোমধ্যে সম্ভাব্য ৩২টি রুট চিহ্নিত করেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাস মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে রুটভিত্তিক বাসের সংখ্যা, পরিচালনাকারী কোম্পানি, কাউন্টার, ডিপো ও লে-ওভার পার্কিং নির্ধারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। বাসের জন্য নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও ন্যূনতম মানদণ্ড রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও বাস চলাচলের রুট ও বাসের সংখ্যা নির্ধারণের দায়িত্ব আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি)। ঢাকায় এ কমিটির সভাপতি মহানগর পুলিশ কমিশনার।

