আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত সংকট ও সামাজিক নানা জটিলতার মধ্যে মানুষ শান্তি ও সমাধানের পথ খোঁজে। কিন্তু এই অনুসন্ধানে অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায় মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। অথচ মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পবিত্র কোরআন মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আত্মিক জীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়।
প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও কোরআন পাঠ, এর অর্থ অনুধাবন এবং শিক্ষাগুলো জীবনে প্রয়োগের অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। ভোরে নামাজের পর কিছু সময় কোরআনচর্চা করে দিনের কাজ শুরু করা হতে পারে এর একটি সুন্দর উপায়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই তা (কোরআন) মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৭৭)
ইসলামি চিন্তাধারায় কোরআনকে মানুষের চরিত্র ও জীবন গঠনের অন্যতম প্রধান নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই ব্যস্ততার অজুহাতে কোরআনচর্চা বাদ না দিয়ে দৈনন্দিন রুটিনে এর জন্য অল্প সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
ব্যস্ততার মধ্যেও কোরআনচর্চার ৭টি উপায় তুলে ধরা হলো—
১. যাতায়াতের সময় কোরআন পড়ুন
কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে যানজটে অনেক সময় নষ্ট হয়। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অযথা সময় ব্যয় না করে কোরআন তিলাওয়াত, বাংলা অনুবাদ কিংবা নির্ভরযোগ্য তাফসির পড়া যেতে পারে। স্মার্টফোনে কোরআন পড়ার বিভিন্ন অ্যাপও ব্যবহার করা যায়। তবে গাড়ি চালানোর সময় ফোনে পড়া বা দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. অবসরে কোরআন তিলাওয়াত শুনুন
সব সময় কোরআন খুলে পড়ার সুযোগ নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যাতায়াতের সময় বা অন্য উপযুক্ত অবসরে কোরআন তিলাওয়াত শোনা যেতে পারে। শায়খ হুজায়ফি, শায়খ সুদাইসি ও শায়খ মিশারির মতো প্রসিদ্ধ কারিদের তিলাওয়াতের পাশাপাশি বাংলাদেশের কারিদের তিলাওয়াতও অনলাইনে পাওয়া যায়। তিলাওয়াত শোনার পাশাপাশি আয়াতের অর্থ জানার চেষ্টা করলে কোরআনের শিক্ষা অনুধাবন সহজ হয়।
৩. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঙ্গে কোরআনচর্চা যুক্ত করুন
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে বা পরে পাঁচ মিনিট করে কোরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এভাবে অল্প অল্প করে নিয়মিত তিলাওয়াতের সুযোগ তৈরি হবে। সময় অনুযায়ী কোনো ওয়াক্তে তিলাওয়াত, অন্য সময়ে আয়াতের অনুবাদ কিংবা তাফসির পড়া যেতে পারে। ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখানে মূল বিষয়।
৪. পরিবারের সঙ্গে কোরআনের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করুন
দুপুর বা রাতের খাবারের সময় পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে হলে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত, সেগুলোর অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এতে পরিবারের ছোট-বড় সবাই উপকৃত হতে পারেন। শিশুদের বয়স ও বোধগম্যতা অনুযায়ী সহজ ভাষায় কোরআনের শিক্ষা তুলে ধরলে তাদের মধ্যেও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
৫. ঘুমানোর আগে ১০ মিনিট সময় দিন
সারাদিন ব্যস্ত থাকার কারণে অনেকের কোরআন পড়ার সুযোগ হয় না। তাঁরা ঘুমানোর আগে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় রাখতে পারেন। এ সময়ে পরিচিত ছোট সুরাগুলো তিলাওয়াতের পাশাপাশি অন্য কোনো সুরা পড়া কিংবা আয়াতের অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা যায়। ঘুমানোর আগে অজু করা এবং কিছু নির্দিষ্ট সুরা পাঠের বিষয়েও হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে।
৬. নামাজে মুখস্থ আয়াত ও সুরা পড়ুন
যাঁরা হাফেজ, তাঁরা ফরজ ও সুন্নত নামাজে ধারাবাহিকভাবে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মুখস্থ অংশ ঝালিয়ে নিতে পারেন। যাঁরা হাফেজ নন, তাঁরাও মুখস্থ করা সুরা ও আয়াত নিয়মিত নামাজে পড়তে পারেন। এতে মুখস্থ অংশ মনে রাখার পাশাপাশি তিলাওয়াতের অভ্যাসও বজায় থাকবে।
৭. কর্মস্থলে রাখুন কোরআন বা তাফসিরের বই
কর্মস্থলে কাজের ফাঁকে কখনো কখনো কিছুটা অবসর পাওয়া যায়। সেই সময়টুকু কাজে লাগাতে ডেস্কে একটি কোরআন শরিফ, অনুবাদ কিংবা নির্ভরযোগ্য তাফসিরের বই রাখা যেতে পারে। অল্প সময়ের নিয়মিত পাঠও দীর্ঘমেয়াদে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সহায়ক হতে পারে।
কোরআনচর্চার গুরুত্ব ও পুরস্কার
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরআন মানুষের জন্য হিদায়াত, রহমত ও সঠিক পথের দিশা। কোরআন পাঠের পাশাপাশি এর অর্থ বোঝা এবং শিক্ষাগুলো ব্যক্তিগত জীবনে অনুসরণের চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর (কোরআন) দ্বারা তিনি তাদের শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদের সরল পথে পরিচালিত করেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১৬)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যখনই কোনো সুরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এটা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? যারা মুমিন, এটা তাদেরই ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারাই আনন্দিত হয়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৪)
তাই ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন অল্প সময় কোরআনচর্চার জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। নিয়মিত তিলাওয়াত, অনুবাদ পাঠ ও শিক্ষার অনুশীলনের মাধ্যমে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করা সম্ভব।
আল্লাহ সবাইকে কোরআনচর্চায় মনোযোগী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

