আধুনিক জীবনে পারিবারিক অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ, স্কুলে বুলিং, পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ কিংবা সহিংসতার অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশু এসব অভিজ্ঞতার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। আচরণে পরিবর্তন, একাকিত্ব, ভয়, ঘুম ও খাওয়ায় অনিয়ম কিংবা পড়াশোনায় অনীহা—এসব লক্ষণ দেখা দিলেও অনেক সময় অভিভাবকেরা তা বুঝতে পারেন না। ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দেরি হয়, যা শিশুর স্বাভাবিক জীবন ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
রাজধানীর আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফা (ছদ্মনাম), বয়স ১১। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর গত তিন বছর ধরে নানা-নানির কাছে থেকে পড়াশোনা করছে সে। স্কুলে যাওয়া-আসার বাইরে তার জীবন যেন থমকে আছে। নানা-নানি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না। খেলাধুলা বা ঘোরাঘুরিতেও আগ্রহ নেই। শ্রেণিকক্ষেও তেমন বন্ধুবান্ধব নেই। ঠিকমতো খেতে চায় না, বেশির ভাগ সময় মন খারাপ করে চুপচাপ থাকে।
আলিফার নানা সোবহান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের আগে তার মাকে প্রায়ই মারধর করতেন বাবা। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সংসার ভেঙে যায়। এরপর থেকেই আলিফা মন খারাপ করে থাকে। দুবার কাউন্সেলিং করানো হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। তাঁর ভাষ্য, বাবা-মায়ের সম্পর্কের ঘটনাগুলো শিশুটির মনে গভীর আঘাত তৈরি করেছে।
আলিফার অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন নয়। পারিবারিক অশান্তি, সহিংসতা কিংবা অন্য কোনো ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হওয়া অনেক শিশু দীর্ঘদিন মানসিক চাপ ও ট্রমার মধ্যে থাকে। যথাসময়ে তাদের অনুভূতি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এর প্রভাব পড়তে পারে পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশ তথ্যচিত্র: ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোর বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে ৫ দশমিক ১ শতাংশ নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগ এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ কনডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত।
শিশুদের ট্রমার পেছনে যেসব কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতা শিশুদের মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। বাবা-মায়ের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া, পারিবারিক সহিংসতা ও বিবাহবিচ্ছেদ শিশুর নিরাপত্তাবোধ নষ্ট করতে পারে। অন্যদিকে পরীক্ষার চাপ, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, বন্ধুদের সঙ্গে বিরোধ, বুলিং এবং কঠোর শাসনও তাদের মনে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। টেলিভিশন বা অনলাইনে সহিংসতার দৃশ্য দেখাও কিছু শিশুর জন্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার কারণ হতে পারে।
কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা রাজিব আহসানের ছেলে সজিব (১৩) রাজধানীর ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শারীরিক গড়ন নিয়ে সহপাঠীদের বুলিংয়ের শিকার হওয়ার পর সে স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করতে শুরু করে।
রাজিব আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রথমে তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি। একদিন ছেলের সমস্যার কথা জানতে চাইলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের বিষয়টি জানানোর পর বুলিং বন্ধ হয়।
রাজনৈতিক সহিংসতার অভিজ্ঞতাও শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহেদ (১৩) ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় পুরান ঢাকায় সহিংস পরিস্থিতি দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
তার বাবা মিল্লাত হোসেন জানান, টেলিভিশনে সহিংসতার দৃশ্য দেখে ছেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একবার প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে পুলিশের একটানা গুলির শব্দ শুনে সে ভীষণ ভয় পায়। প্রায় দুই মাস তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। তবে ওই সময়ের স্মৃতি এখনো সে ভুলতে পারেনি।
পড়াশোনার চাপেও বাড়ছে মানসিক সংকট
শিশুদের মানসিক চাপের আরেকটি বড় কারণ অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপমানজনক আচরণ। রাজধানীর শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবা (১৪) এর একটি উদাহরণ।
সাবার মা নাজিয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাঁর মেয়ে আগে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ত। ক্লাসের পড়া ঠিকমতো বলতে না পারলে কিংবা পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে শিক্ষকদের কাছ থেকে অপমানজনক কথা শুনতে হতো। এ ধরনের পরিস্থিতি বারবার ঘটতে থাকায় তার মধ্যে ধীরে ধীরে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়।
একপর্যায়ে বাসায় কেউ জোরে কথা বললে কিংবা বাইরে হঠাৎ কোনো শব্দ হলেও সাবা আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। শুরুতে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টিকে পড়াশোনায় অনীহা বা অজুহাত হিসেবে দেখেছিলেন। পরে একদিন বাসার শিক্ষকের কাছে পড়া না পারায় বকা খেয়ে তার প্যানিক অ্যাটাক হয়। সে সময় তার হাত-পা শক্ত হয়ে যায়, মুখ দিয়ে লালা বের হতে থাকে এবং সে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে। পরিবার দ্রুত তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। চিকিৎসক অতিরিক্ত মানসিক চাপকে এ পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানান।
নাজিয়া বেগম বলেন, আগে তাঁরা বুঝতে পারেননি, ছোট ছোট ঘটনাও একটি শিশুর মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এখন তাঁরা উপলব্ধি করেছেন, শিশুরা সব সময় নিজেদের কষ্ট মুখে প্রকাশ করতে পারে না; আচরণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ পেতে পারে। পরে সাবার স্কুল পরিবর্তন করা হয় এবং পড়াশোনা নিয়ে তার ওপর চাপ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মানসিক চাপের লক্ষণ কীভাবে বুঝবেন
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, চাপের পরিস্থিতিতে শরীর অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোন তৈরি করে। এগুলো শরীরকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে, যা ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিচিত। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র চাপ শিশুর শরীর ও মনে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
শারীরিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দ্রুত শ্বাস নেওয়া, ঘাম হওয়া এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
- মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা ও ঘুমের সমস্যা।
- বমি বমি ভাব, বদহজম বা অন্যান্য হজমজনিত সমস্যা।
- অতিরিক্ত বা কম খাওয়ার কারণে ওজনের পরিবর্তন।
- শরীরে অস্বস্তি, ব্যথা কিংবা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়া।
আবেগীয় ও মানসিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- অল্পতেই রেগে যাওয়া, বিরক্তি বা মেজাজের পরিবর্তন।
- পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
- পড়াশোনা বা অন্য কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা।
- দায়িত্ব পালনে অনীহা কিংবা আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারানো।
- দীর্ঘ সময় মন খারাপ থাকা, কান্নাকাটি বা দুঃখ অনুভব করা।
এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে শিশুটি ট্রমায় আক্রান্ত, তা নয়। তবে আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ট্রমার প্রভাব পড়তে পারে দীর্ঘমেয়াদে
তীব্র মানসিক চাপ বা ট্রমার পর শিশুর মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। কোনো খারাপ ঘটনা আবার ঘটবে—এমন আশঙ্কায় সে সব সময় ভীত থাকতে পারে। কেউ কেউ দুঃখী ও বিষণ্ন হয়ে পড়ে, আবার কেউ ছোটখাটো বিষয়েও রেগে যায় বা বিরক্তি প্রকাশ করে।
এর প্রভাব পড়তে পারে স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনায় মনোযোগ, বন্ধুত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। শিশুটি খেলাধুলা বা সামাজিক কার্যক্রমে আগ্রহ হারাতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ ও ক্ষোভও বাড়তে পারে। ফলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও সামাজিকভাবে মিশে চলার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে যথাযথ সহায়তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনে পেশাদার চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অনেক শিশুই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।
শিশুকে ট্রমা থেকে উত্তরণে সহায়তা করবেন যেভাবে
শিশুর মানসিক চাপ ও ট্রমা মোকাবিলায় বাবা-মা এবং নিকটাত্মীয়দের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকেরা শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে পেশাদার মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশুকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। সে কী অনুভব করছে এবং কোন বিষয়গুলো তাকে কষ্ট দিচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজন হলে পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নিতে হবে, যিনি শিশুকে ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারেন।
তিনি বলেন, শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে বাবা-মাকে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। প্রত্যেক প্রজন্মের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আলাদা। বাবা-মা নিজেদের শৈশবের সঙ্গে সন্তানের অভিজ্ঞতা তুলনা করে একই ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করলে ভুল হতে পারে। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে নিজের সন্তানের ছোট ছোট অর্জনের প্রশংসা করা এবং তাকে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
অভিভাবকদের সতর্ক করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘তোমার সঙ্গে এই বাচ্চাটা পেরেছে, তুমি কেন পারবে না?’—এ ধরনের কথা শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। পরীক্ষার ফলাফল বা প্রতিযোগিতায় সাফল্যকে সন্তানের যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়। অভিভাবকের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার হতাশা শিশুর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে বকাঝকা বা শাস্তি না দিয়ে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কঠোর ভাষার পরিবর্তে সহানুভূতিশীল আচরণ এবং আন্তরিক কথোপকথনের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তুচ্ছ মনে হওয়া কোনো ঘটনা শিশুর কাছে গভীর কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং ভয়, কষ্ট ও সমস্যার কথা নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারে—এমন নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশুর মানসিক সুস্থতার জন্য পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—দুই জায়গাতেই সহমর্মিতা, নিরাপত্তা এবং সহযোগিতার পরিবেশ প্রয়োজন। শিশু যেন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, ভুল করলে অপমানিত হওয়ার ভয় না পায় এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাইতে পারে—এমন পরিবেশ গড়ে তোলাই হতে পারে ট্রমা মোকাবিলার প্রথম পদক্ষেপ।

