রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

দিল্লির বিক্ষোভ আরও জোরদারের ডাক, প্রতিদিন যন্তর মন্তরে মিছিল

নিউজ ডেস্ক

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে সমাবেশের ডাক দেওয়ার পর ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটে। সংগঠনটির দাবি, প্রায় তিন হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তবে রবিবার (১১ অক্টোবর) আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে সিজেপি জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিল চলবে।

আনন্দবাজার, এনডিটিভি ও দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভের ডাক দেয় সিজেপি। পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি না দিলেও সংগঠনটি আন্দোলনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।

বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্তর মন্তরগামী সড়কগুলোতে সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয় এবং ড্রোন, বডিক্যামসহ বিভিন্ন নজরদারি সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখা, ২৫০টির বেশি ট্রেন বাতিল এবং যন্তর মন্তরের চারপাশের চার কিলোমিটার এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য মোতায়েন এবং একাধিক অস্থায়ী আটক শিবির তৈরির তথ্যও এসেছে প্রতিবেদনে।

শনিবার সকাল থেকে কনট প্লেস, দিল্লি হাট, বিভিন্ন হোটেল ও বাসা থেকে বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। আইসার সভাপতি নেহা বোরার নেতৃত্বে দিল্লি হাটের কাছে বিক্ষোভের চেষ্টা হলেও পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মুম্বাই থেকে আসা একটি বিমান দিল্লিতে অবতরণের পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়। তাঁদের আলাদা স্থানে নেওয়া হয়। আটকের আগে ধারণ করা ভিডিওতে দীপকে পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন এবং জানান, তিনি আটক হলে অজিঙ্ক শিন্দে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন।

এদিন দীপকের ঠাকুরমা মহারাষ্ট্রে মারা যান। তখন তিনি পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। পুলিশ তাঁকে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। গুরুগ্রাম থেকে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকেও আটক করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত পর্যন্ত বেশির ভাগ আটক ব্যক্তি মুক্তি পেলেও দীপকে, রাঠীসহ চারজন হেফাজতে ছিলেন।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রীর নামও এসেছে—দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার।

কেজরিওয়ালের বাসভবন সকাল থেকে ঘিরে রাখা হয়। যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে আটক করে বাসে তোলা হয়। এর আগে তিনি ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচির ডাক দিয়ে ভোট চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে, সাউথ অ্যাভিনিউয়ের বাসা থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাসস্ট্যান্ডে বসে প্রতিবাদ করেন। পরে ডেরেক ও’ব্রায়েন ও দোলা সেনসহ পাঁচ সাংসদকে নিয়ে তাঁকে ভ্যানে তোলা হয়। মমতা অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি জরুরি অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ইন্ডিয়া জোট আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

সাবেক কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিরোধী নেতাদের আটকের সমালোচনা করেন। এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বাম নেতা এম এ বেবি, বৃন্দা কারাত ও দীপঙ্কর ভট্টাচার্য; কর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণ; আম আদমি পার্টির সঞ্জয় সিং, সৌরভ ভরদ্বাজ ও গোপাল রাই; তৃণমূলের সাকেত গোখলে এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী।

চেন্নাইয়ে একটি অনুষ্ঠানে থাকা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। অন্য এক ভিডিও বার্তায় তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, আরএসএসপ্রধান মোহন ভাগবত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়া জোটের নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্তের দাবি জানান। বৈঠক শেষে রাহুল গান্ধী বলেন, রাষ্ট্রপতি ভোট চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেননি।

শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতা অজিঙ্ক শিন্দে বলেন, ধরপাকড় করে আন্দোলন থামানো যাবে না। তিনি ঘোষণা করেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা বা তাঁকে পদ থেকে সরানো না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিল হবে। রবিবার আরও বড় পরিসরে আন্দোলনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, রবিবার থেকে ছাত্র বিক্ষোভ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বিক্ষোভ হবে শান্তিপূর্ণ। দিল্লির বাইরে মুম্বাই, চেন্নাই ও আহমেদাবাদেও সমর্থনে বিক্ষোভ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দান থেকে প্রায় ২০০ জনকে আটক করার কথাও বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিজেপি মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ বিরোধীদের আন্দোলনের সমালোচনা করে বলেন, ভারত ‘কলার প্রজাতন্ত্র’ নয়। তাঁর দাবি, দেশের গণতন্ত্র নৈরাজ্যের চেষ্টা প্রতিহত করেছে এবং দেশ পরিচালিত হবে সংসদের মাধ্যমে, রাজপথের মাধ্যমে নয়। এ সময় তিনি আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও পুদুচেরির উপনির্বাচনে এনডিএর জয়ের কথাও উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে ইন্ডিয়া জোট চার দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইন বাতিল, এসআইআর স্থগিত করে বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহাল, সব নির্বাচনে ব্যালট পেপার ফিরিয়ে আনা এবং গত দুই বছরে ভোট চুরির প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করা বিধানসভা নির্বাচন বাতিল করা। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছেও স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে জোট।

এদিকে, কর্মী সোনম ওয়াংচুক অভিযোগ করেছেন, দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। আটক ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে অনশন বা পদযাত্রার মতো কর্মসূচি নেওয়ার কথা ভাববেন বলেও জানান তিনি।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন