বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী আয়োজন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা শুরু হচ্ছে আজ সোমবার। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে ১৯১টি দেশের ১৫ হাজারের বেশি প্রতিনিধি অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশের নতুন ঋণ কর্মসূচিও এবারের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশের পক্ষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে।
বর্তমান সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, আগের ঋণ কর্মসূচির শর্তের পরিবর্তে নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা ও বিকল্প অর্থায়নের পথকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে নতুনভাবে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার শর্তের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতায় অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আইএমএফের সঙ্গে তিন বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং সরকারি ভর্তুকির মতো বিষয়গুলোতে শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ কর্মসূচির চুক্তি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ব্যাংকিং, রাজস্বসহ আর্থিক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে সরকার নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহযোগিতা চাওয়া হবে। তাঁর মতে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে নেওয়া সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমাতে ডলার বন্ড, বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড, সামুরাই বন্ড ও প্যান্ডা বন্ডের মতো বিকল্প অর্থায়ন উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্থায়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায় সরকার।
এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। ওই কর্মসূচির সাত কিস্তির মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণের শর্ত নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে বর্তমান সরকার নতুন কর্মসূচির পথে এগোচ্ছে।
এদিকে, আগামী ২৯ অক্টোবর আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহের এ সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আগের ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করা হবে। ফলে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আয়োজক হয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সম্মেলনকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে ১০৫ কোটি থেকে ২২৫ কোটি বাথ যুক্ত হতে পারে। প্রতিনিধিদের যাতায়াতের জন্য ৩২০টির বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংকক ও আশপাশের এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের কারণে জলাবদ্ধতা ও যানজটের আশঙ্কাও রয়েছে।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের নিরাপত্তায় প্রায় ৫০০ পর্যটন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। সভাস্থল, হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রে নজরদারির পাশাপাশি টহল ও ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, ঋণ পরিস্থিতি ও উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতিগত আলোচনা হয় আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায়। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের নতুন ঋণ কর্মসূচি, নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা এবং বিকল্প অর্থায়নের উদ্যোগ কতটা অগ্রসর হয়, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

