ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। নিরাপত্তা জোরদার, ধরপাকড় ও যান চলাচলে বিধিনিষেধের মধ্যে এবার নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে যন্তর মন্তরকে বাদ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। বিকল্প হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী শিবিরের আন্দোলন ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। প্রতিবাদের স্থান পরিবর্তন করা হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের হুঁশিয়ারি, প্রয়োজনে গোটা দেশকেই যন্তর মন্তরে পরিণত করা হবে।
গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন থেকে সরে আসেননি সিজেপির অভিজিৎ দীপক, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার হুমকির মুখে পড়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
অভিজিৎ দীপক বলেন, যন্তর মন্তরে আন্দোলনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হলেও প্রতিবাদ থামবে না। বরং গোটা দেশকেই যন্তর মন্তরে পরিণত করা হবে।
সৌরভ দাসের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিকের অধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগের পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিকভাবেই লড়াই চলবে। আশুতোষ রাঙ্কাও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
সোমবার যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের দিন ও সময় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে দিল্লি পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছে সিজেপি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুমতি না মিললে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ফলে প্রতিবাদের স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পরও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের আগেই রাজধানীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন, ব্যারিকেড স্থাপন, যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং বিক্ষোভকারীদের আটকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিক্ষোভের দিন বহু মানুষকে আটক করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতেও প্রতিবাদস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি অব্যাহত থাকে।
পরিস্থিতি ঘিরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারির প্রশ্ন সামনে এলেও দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই আন্দোলন ঠেকাতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করাকে ঘিরে প্রশাসনের পদক্ষেপ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে যন্তর মন্তরকে সরিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন তিনটি স্থান হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান।
প্রশাসনের যুক্তি, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ পরিচালনার জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, কেন্দ্রীয় দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকা থেকে দূরের মাঠে আন্দোলন সরিয়ে দিলে বিক্ষোভের দৃশ্যমানতা ও জনসমর্থন তুলে ধরার সুযোগ কমতে পারে।
সিজেপি, ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো যখন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার করছে, তখনই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা চলছে।
এদিকে আন্দোলনের আঁচ পৌঁছেছে সুপ্রিম কোর্টের দরজাতেও। সোমবার রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়্গেসহ বিরোধী নেতারা ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিলেন। তবে প্রধান বিচারপতি তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। সংশ্লিষ্ট বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আবেদন জানানোর পথ খোলা রয়েছে বলে জানানো হয়। ফলে সরাসরি স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা সফল হয়নি।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
১০ অক্টোবরের ধরপাকড়, ১১ অক্টোবরের আদালত-সংশ্লিষ্ট ঘটনা এবং ১২ অক্টোবর যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে দিল্লির পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে।
একদিকে প্রশাসনের সামনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের সামনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার বজায় রাখার প্রশ্ন। সিজেপির বার্তা স্পষ্ট—প্রতিবাদের ময়দান বদলালেও আন্দোলন থামবে না।

