আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলমের অবস্থান, বিদেশে জীবনযাপন এবং দেশে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা তথ্য সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যম যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি বর্তমানে ভারতের কলকাতার নিউটাউনে বসবাস করছেন। দেশে তাঁর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পদের দেখভাল করছেন পরিবারের সদস্য, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে শাহরিয়ার আলম রাজশাহী ছেড়ে সড়কপথে গেদে সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে থাইল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কলকাতার নিউটাউনে দ্বিতীয় স্ত্রী সিলভিয়া পারভীন লেনিকে নিয়ে একটি বড় ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্র ও রাজশাহী অঞ্চলের কয়েকজন নেতার যাতায়াত রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে তাঁর কাছে অর্থ পাঠানো হচ্ছে এবং তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে চীন, রাশিয়া ও ব্রাজিল সফর করছেন। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
একাধিক মামলা ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজশাহীর তিনটি থানায় শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহরিয়ারের ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৬০ কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
তৈরি পোশাক ব্যবসায় অংশীদারদের ভূমিকা
২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শাহরিয়ার আলমের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাঈমুল বাশার চৌধুরী এবং পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ সাঈদ। শাহরিয়ারের অনুপস্থিতিতে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তাঁরা দেখভাল করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেডেও শাহরিয়ারের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার আলম বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে নাঈমুল বাশার চৌধুরী প্রতিনিধিত্ব করছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সাউথইস্ট টেক্সটাইলস লিমিটেডে তাঁর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নাঈমুল বাশার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে রেনেসাঁ গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ বলেন, শাহরিয়ার আলম প্রতিষ্ঠানটির একজন শেয়ারহোল্ডার। তিনি বর্তমানে ব্যবসায় সক্রিয় না থাকলেও অন্যরা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
ব্যক্তিগত সম্পদ দেখভালে পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহরিয়ার আলমের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সম্পদ দেখভাল করছেন তাঁর বাবা মো. শামসুদ্দিন, ভাই সাইফুল ইসলাম বাদল এবং কয়েকজন রাজনৈতিক সহযোগী। তাঁদের মধ্যে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হাসানুর সজল, বাঘা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা খাতুন লতার ছেলে তানজিম এবং চারঘাটের তসিকুল নামের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরীতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বারিন্দ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে তোলার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে শাহরিয়ারের বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসকদের একটি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের তহবিলে শাহরিয়ারের পক্ষ থেকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি।
জমি ও ফ্ল্যাট কেনা নিয়ে অভিযোগ
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২০ সালে রাজশাহীর বাঘার ব্যবসায়ী গোলাম হোসেনের ঋণসংকটের সুযোগ নিয়ে তাঁর প্রায় ৪০ বিঘা জমি নামমাত্র মূল্যে নেওয়া হয়। পরে সেখানে বরেন্দ্র এগ্রো ফার্ম গড়ে তোলা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গোলাম হোসেনের জমি অধিগ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে শাহরিয়ার আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাহরিয়ারের নামে বা তাঁর সংশ্লিষ্টতায় রাজশাহী, ঢাকা, বাঘা, চারঘাট, লালপুর ও ঈশ্বরদীতে বিপুল পরিমাণ জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ঢাকার গুলশানে তাঁর নামে দুটি এবং ছেলের নামে একটি ফ্ল্যাট থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সম্পদ ও ব্যবসার বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহরিয়ারের বাবা শামসুদ্দিন এবং ভাই সাইফুল ইসলাম বাদলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
শাহরিয়ার আলমের বিদেশে অবস্থান, ব্যবসা পরিচালনা, সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

