রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

আ.লীগ নেতারা ক্ষমা চাইলেও সমঝোতার সম্ভাবনা নেই: ডা. জাহেদ

নিউজ ডেস্ক

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর বাস্তব সম্ভাবনা দেখছেন না প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। দলটি অতীতের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা সরকার দেয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণায় সরকারের কোনো উদ্বেগ নেই জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার নিজেই তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে সরকারের অবস্থান

গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে কিছু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার করতেই তিনি নতুন করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। রাজনৈতিক সমঝোতার আলোচনা কোনোভাবেই বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। তবে অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ টেনে উপদেষ্টা বলেন, দলটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের পর ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু এতদিন পরও দলটির পক্ষ থেকে অপরাধ স্বীকার বা অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। বরং তাদের কর্মকাণ্ডে উসকানি ও সংঘাত সৃষ্টির প্রবণতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশের ভেতরে সন্ত্রাস ও সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে—এমন একটি দলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান সহজেই অনুমেয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইতোমধ্যে বিচার ও রায় হয়েছে। বাকি বিচারিক প্রক্রিয়াও চলবে।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং দলটি আবার রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কি না, সেই বিষয়গুলোও বিচারিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা।

ক্ষমা চাইলেই শুরু হবে না সমঝোতার আলোচনা

আওয়ামী লীগ অতীতের অপরাধের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়া প্রত্যাশিত হতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইলেই সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে, সরকার এমন কোনো শর্ত দেয়নি।

তিনি বলেন, ‘এটা শর্ত না যে, এটা করলে আলোচনা শুরু হতে পারে। মোটেও না। এটা করলে আলাপ শুরু করা যাবে কি না, সেই আলাপ পরে হতে পারে।’

উপদেষ্টার ভাষ্য, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ অপরাধের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় আলোচনা আদৌ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সেটি কেবল তাত্ত্বিক বিষয়; সরকার এখনই কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা প্রক্রিয়ায় যেতে চাইছে, এমন অর্থ করা ঠিক হবে না।

আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের বাইরেও দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে ৪৫০টির বেশি মামলা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত বিপুলসংখ্যক মামলা হলে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনে কী প্রভাব পড়ে, তা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান উপদেষ্টা। বিষয়টি নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, অতীতের এসব কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যায় না। রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদেরও এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক সমঝোতার আলোচনা বিভিন্ন মহলে উঠেছিল। সে সময়ও অপরাধ স্বীকার ও অনুশোচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু এরপর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন না তিনি।

উপদেষ্টার অভিযোগ, ক্ষমা চাওয়া বা অনুতাপ প্রকাশের পরিবর্তে দলটির নেতারা হুমকি দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশে সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার মতো উসকানিমূলক বক্তব্যও এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা সম্পর্কে নিজের অবস্থান জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে আসলে একেবারেই দেখি না।’ ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কী করা হবে, তা তখনকার বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে উদ্বেগ নেই সরকারের

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে সরকার কোনো চাপ বা উদ্বেগে আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট।

তিনি বলেন, সরকার শুরু থেকেই শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করতে চায়।

উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা চাইছি উনি আসুক। আমাদের কি কোনো অস্পষ্টতা আছে যে শেখ হাসিনাকে আমরা চাই না বাংলাদেশে?’

শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে সরকার কী করবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার নিজেই চেষ্টা করছে, তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলে সরকারের কোনো সমস্যা নেই।

তার ভাষায়, ‘আমরা তো তাকে ধরে আনতে চাইছি। আমরা তো ভারতকে বলছি, তাকে আমাদের হাতে হস্তান্তর করুন। তিনি যদি চলে আসেন, সেখানে আমাদের কোনো সমস্যার কিছু নেই।’

জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। তার মতো একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের বিচার বাংলাদেশে নিশ্চিত করা না গেলে তা দুঃখজনক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বাংলাদেশ

শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রসঙ্গেও শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনা হয়েছে। শুধু মৌখিকভাবে দাবি জানানো হয়নি, আদালতের রায়ের বিষয়টিও ভারতকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হলেই ভারত তাকে হস্তান্তর করবে, বিষয়টি এমন নয় বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। ভারতের নিজস্ব অবস্থান ও বক্তব্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রত্যর্পণের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগে কোনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই। বাংলাদেশ তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং সেই অবস্থান থেকেই বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ড. ইউনূসকে হেনস্তা ও প্রতিশোধমূলক আচরণের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা

সংবাদ ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ এবং জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণের প্রসঙ্গও উঠে আসে।

এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন জাহেদ উর রহমান। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্ত, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য তিনি ব্রিফিংয়ে তুলে ধরেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিচার ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন