রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

৮ মাসে বিদেশ গেছেন সাড়ে ৪ লাখ কর্মী, আসছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার

নিউজ ডেস্ক

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের ১০৯টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বৈধভাবে পাড়ি জমিয়েছেন ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২১ জন বাংলাদেশি কর্মী। একই সময়ে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও নতুন দেশ ও খাতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে সরকার।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। দেশটিতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০৮ জন। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে ৫৩ হাজার ২৯৭ জন, কাতারে ৪২ হাজার ৫১৬ জন, মালদ্বীপে ২৪ হাজার ৭০ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার ৬৬১ জন এবং কুয়েতে ২০ হাজার ২৫৪ জন গেছেন।

একই সময়ে জর্ডানে ১০ হাজার ১০ জন, ইতালিতে ৭ হাজার ৭৭ জন, পর্তুগালে ৫ হাজার ৩৮৬ জন এবং ইরাকে ২ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। এ ছাড়া মরিশাসে ২ হাজার ৭১৪ জন, সার্বিয়ায় ২ হাজার ৫৫০ জন, ফিজিতে ২ হাজার ৪৪৩ জন, বেলারুশে ২ হাজার ২২২ জন এবং রাশিয়ায় ২ হাজার ২০৬ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি কর্মী অবৈধ হয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কর্মী গেছেন বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে সংকট তৈরি হওয়ায় সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে। বর্তমানে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিভিন্ন দেশে সফর করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করছেন।

রেমিট্যান্সে প্রবাহ অব্যাহত

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ২ হাজার ৫৭৩ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

মাসভিত্তিক হিসাবে ফেব্রুয়ারিতে ৩০১ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার ডলার, মে মাসে ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার, জুনে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার ডলার, জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, আগস্টে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে দেশে এসেছে আরও ৯৯ কোটি মার্কিন ডলার।

নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ ছাড়া কলিং ভিসার আওতায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতাও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।

২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত শ্রমবাজার-সংক্রান্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন চুক্তির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় আরও বেশি কর্মী পাঠানোর আশা করছে বাংলাদেশ।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান বিভিন্ন খাতে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতালির রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেসান্দ্রো স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রতিবছর প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে পরিবারসহ ইতালিতে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

কাতারও দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত মে মাসে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে দেশটির শ্রমমন্ত্রী আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররি ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডিং, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের কারিগরি কাজ এবং প্লাম্বিং খাতে দক্ষ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান। বাংলাদেশ কাতারকে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা দিয়েছে। কাতার তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

এ ছাড়া দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানি ৬ হাজার দক্ষ চালক নিয়োগের আগ্রহ জানিয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বাংলাদেশি কর্মীদের দুবাই যাওয়ার খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

নিরাপদ অভিবাসন ও প্রবাসী কার্ডে গুরুত্ব

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হলেও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন করে কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে। প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড দ্রুত বিতরণের কাজও চলছে বলে জানান মন্ত্রী।

প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করতে মন্ত্রণালয় ও সরকার কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও মালয়েশিয়া, ওমান, ইতালি, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। নতুন শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানো, প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানো—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন