রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার ঋণগ্রস্ত, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি

নিউজ ডেস্ক

দেশের প্রায় ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ঋণ নিতে হচ্ছে এসব পরিবারকে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় ঋণগ্রস্ত পরিবারের হার বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক বিশেষ জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে।

বিবিএসের ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক জরিপটি পরিচালিত হয় জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে। নবম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ তৈরিতে সহায়তা করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গ্রামীণ এলাকার ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করেছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।

আয়ের চেয়ে মাসিক ব্যয় বেশি

জরিপে দেখা গেছে, দেশে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মাসে আয়ের তুলনায় গড়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।

এলাকাভেদে পরিবারের ব্যয়ের পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারপ্রতি গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। শহরাঞ্চলে এ ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।

২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে পরিবারপ্রতি জাতীয় গড় মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন জরিপে আয় ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে। তবে এবার গড় ব্যয় গড় আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় পরিবারগুলোর আর্থিক চাপের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এতে গ্রাম, শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার মোট ৩ হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে ট্যাবলেট ডিভাইস ব্যবহার করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকটে বাড়ছে চাপ

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, জরিপের ফলাফল দেশের দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। তাঁর মতে, মহামারির পর থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে এবং কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে আছে। একই সময়ে মানুষের প্রকৃত মজুরিও কমেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। বিবিএসের মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশায় নিয়োজিত স্বল্প আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি এ সূচকে বিবেচনা করা হয়।

গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনেও দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও শ্রমের চাহিদায় ঘাটতিকে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করছে। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং বিশেষ করে শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।

আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি ও কর্মসংস্থানের সংকট—সব মিলিয়ে দেশের পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া পরিবারের উচ্চ হার সেই চাপেরই প্রতিফলন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন