রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

‘আমার মৃত্যুর জন্য কবির দায়ী’ ভিডিও বার্তা রেখে দুই সন্তানের জননীর মৃত্যু

হুমায়ন কবির মিরাজ, বেনাপোল

আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র কবির দায়ী, আর কেউ নয় মৃত্যুর আগে নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও বার্তায় এমন কথা বলে গেছেন যশোরের শার্শার চম্পা খাতুন (৩০)। পরিবারের দাবি, শিক্ষক কবির হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের জেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। পরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই তরিকুল ইসলাম বাদী হয়ে শিক্ষক কবির হোসেনসহ দুজনের বিরুদ্ধে শার্শা থানায় মামলা করেছেন।

নিহত চম্পা খাতুন উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের ধান্যতাড়া গ্রামের মৃত আহাদ আলীর মেয়ে। প্রায় ১৬ বছর আগে একই গ্রামের মৃত সাইফুল্লাহ গাজীর ছেলে প্রবাসী মিন্টু গাজীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে ১২ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী মেয়ে ও ৬ বছরের এক ছেলে রয়েছে। সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় পাঁচ বছর আগে জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমান মিন্টু গাজী।

নিহতের পরিবারের ভাষ্য, স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে ভবানীপুর গ্রামের মৃত নাজিমুদ্দিন (সোলেমান)-এর ছেলে শিক্ষক কবির হোসেনের সঙ্গে চম্পা খাতুনের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিবারের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে তাদের মধ্যে এ সম্পর্ক চলছিল। এ সময়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে কবির হোসেন বিভিন্ন সময়ে চম্পার কাছ থেকে এবং তার প্রবাসী স্বামীর পাঠানো অর্থ নেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

সম্প্রতি কবির হোসেন চম্পাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। এরপর থেকেই চম্পা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে দাবি স্বজনদের।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন সকালে চম্পা গ্যাস টেবলেট খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ফোনে বিষয়টি তার ভাইকে জানান। খবর পেয়ে স্বজনরা তাকে প্রথমে বাগআঁচড়ার একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নাভারন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা চম্পা খাতুনকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের ফুপা আমিরুল বলেন, রাত ১০টার দিকে আমরা মামলা করতে থানায় যাই। তখন চম্পার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ও শিক্ষক কবির হোসেনের স্বজনরা থানায় উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আসামিপক্ষের হয়ে কায়বা ইউনিয়ন বিএনপির কয়েকজন নেতা মামলা না করার পক্ষে দাঁড়ান। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনা ও দর-কষাকষি চলতে থাকে। এসব কারণে মামলা নিতে দেরি করা হয়। বিভিন্ন বিষয় দেখিয়ে রাতভর মামলা নেওয়া হয়নি। আমরা রাত ৪টা পর্যন্ত থানায় অবস্থান করেও মামলা করতে পারিনি। পরে বাধ্য হয়ে থানা থেকে ফিরে আসি। এরপর বিভিন্ন আলোচনা ও প্রক্রিয়া শেষে পরদিন দুপুর ১টার দিকে মামলা গ্রহণ করা হয়। পরে নিহতের ভাই তরিকুল ইসলাম বাদী হয়ে শার্শা থানায় ভবানীপুর গ্রামের শিক্ষক কবির হোসেনসহ দুজনকে আসামি করে মামলা করেন।

এদিকে মৃত্যুর আগে চম্পা খাতুন নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। পরিবারের দাবি, ওই ভিডিওতে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষক কবির হোসেনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন এবং নিজের মৃত্যুর জন্য কবির হোসেনকে দায়ী করেন।ভিডিও বার্তায় চম্পা বলেন, সে আমার সব শেষ করেছে। আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র কবির দায়ী, আর কেউ নয়।

চম্পার মৃত্যুর আগে ধারণ করা ওই ভিডিও বার্তাকে ঘিরে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। তবে ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।

শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি শামিনুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় শার্শা থানায় দুজন সহ অজ্ঞাত ৩/৪ জনের নামে আত্নহত্যা প্ররোচনা মামলা হয়েছে।আসামিদের আটকের জোর চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন