রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

অধিদপ্তরে রূপান্তর হচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বদলাবে প্রশাসনিক কাঠামো

নিউজ ডেস্ক

ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবলসহ সাংগঠনিক কাঠামোর খসড়া তৈরি করে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাঠাতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। এ নির্দেশনার পর প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হলে বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আসবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়তে পারে। তবে বিলুপ্ত হবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বোর্ড অব গভর্নরসের কাঠামো। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তা, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানটিকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের দাবি জানিয়ে আসছেন। এবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালুর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারের পরিকল্পনায় মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় কর্মরত ১০ লাখের বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা রয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা পর্যায়েও কার্যালয় ও প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির নির্দেশ

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালুর বিষয়ে গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সেলের সপ্তম সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য খসড়া সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চেকলিস্টসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী বলেন, বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের। প্রস্তাবটি বোর্ড অব গভর্নরসের কাছে উপস্থাপন করা হবে। তবে অধিদপ্তরে রূপান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বোর্ডের সিদ্ধান্তের জন্যও অপেক্ষা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। বোর্ড অব গভর্নরসের মতামত ও অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বোর্ডের বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

বোর্ডের ক্ষমতা কমবে, বাড়বে সরকারের নিয়ন্ত্রণ

বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৭৫ সালের ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইনের অধীনে পরিচালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এর নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বোর্ড অব গভর্নরস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হলে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হবে। ফলে বর্তমান স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা আর থাকবে না এবং বোর্ড অব গভর্নরসের বিদ্যমান কাঠামোও বিলুপ্ত হবে বলে জানিয়েছেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের সংস্থা অধিশাখার যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন অধিদপ্তর হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়তে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য বোর্ডের সভা ও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। দীর্ঘদিন বোর্ডের সভা না হওয়ায় কার্যক্রমেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হলে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত দিতে পারবে।

বর্তমানে কোন বই প্রকাশ করা হবে, কী ধরনের গবেষণা পরিচালিত হবে এবং বাজেট কীভাবে প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হবে—এসব ক্ষেত্রেও বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অধিদপ্তর হলে এসব বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

চাকরি, পেনশন ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে আলোচনা

অধিদপ্তরে রূপান্তরের সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে চাকরির নিশ্চয়তা এবং রাজস্ব খাতে জনবল বাড়ার বিষয়টি রয়েছে। তবে বর্তমানে কর্মরত কতজনকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, আর্থিক সুবিধা কতটা বাড়বে কিংবা নতুন করে কত পদ সৃষ্টি হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে ২ হাজার ৩১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সম্মানি বা ভাতার ভিত্তিতে ৭১ হাজার ১৮৫ জনসহ মোট ৮৪ হাজার ২৫৩ জন কর্মরত রয়েছেন। তবে উল্লিখিত উপখাতগুলোর সংখ্যার সঙ্গে মোট জনবলের হিসাবে অসংগতি রয়েছে; এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী বলেন, অধিদপ্তর হলে রাজস্ব খাতে জনবল বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে রাজস্ব খাতের কর্মীদের পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক কর্মীরাও কাজ করছেন। কোন পর্যায়ের কর্মীদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং মোট জনবল কত হবে, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, অধিদপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি থাকে। কর্মীদের দাবি, তারা যেন পূর্ণ পেনশন পান। বর্তমানে সরকার বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব আয়ও করতে হয়। অধিদপ্তরে রূপান্তর হলে এ আর্থিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।

আইন পরিবর্তন ও সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। সরকারের সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে যে আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হলে সেই আইন রহিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জনবল বাড়বে নাকি কমবে, তা সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এককভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকবে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও প্রয়োজন হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পৌঁছায়নি। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বোর্ড অব গভর্নরসের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব তৈরির কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন যুগ্ম সচিব।

ধর্মীয় ও গবেষণামূলক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

অধিদপ্তরে রূপান্তর হলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসার সম্ভাবনা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির ধর্মীয় ও গবেষণামূলক কাজের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে বোর্ড অব গভর্নরসের মাধ্যমে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিছু সিদ্ধান্ত নিজস্ব বিবেচনায় নিতে পারে। সরকারি অধিদপ্তরে পরিণত হলে সেই সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ফাউন্ডেশনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো থাকলে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

তবে তাদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে স্বায়ত্তশাসন একটি কার্যকর ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্নভাবে সরকারের প্রভাবের মধ্যে থাকে। ফলে কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকলেও বাস্তবে সরকারের প্রভাব এড়ানো কঠিন।

উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। ধর্মীয় কল্যাণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী জানান, উপজেলা পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ রয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন কার্যক্রম মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে মডেল মসজিদ রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কিছু কর্মী এবং গণশিক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত জনবলও কাজ করছেন।

তবে নতুন কার্যালয় স্থাপন, প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি, জনবল কাঠামো নির্ধারণ এবং বিদ্যমান কর্মীদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে প্রস্তাব পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর। ফলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হলেও এর চূড়ান্ত কাঠামো, জনবল ও আর্থিক সুবিধার বিষয়গুলো এখনো নির্ধারিত হয়নি।

 

সূত্র: জাগো নিউজ

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন