স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দল। হেফাজতে ইসলামীর উদ্যোগে গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে কর্মসূচি পালনের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে অন্য রাজনৈতিক জোট থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে এখনো ঐকমত্য হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামীর মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান।
জোট গঠনের আলোচনায় থাকা সাতটি দল হলো—চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
বৈঠক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আপাতত দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কর্মসূচি নির্ধারণ ও জোটের কাঠামো ঠিক করবে। আগামী ৫ ডিসেম্বর লিয়াজোঁ কমিটির পরবর্তী বৈঠকে জোটের ভবিষ্যৎ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
অন্য জোট ছাড়ার প্রশ্নে মতভেদ
সাত দলের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে রয়েছে। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির জোটের সঙ্গে যুক্ত। হেফাজতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আগে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, জামায়াতের সঙ্গে থাকা দলগুলোকে ওই জোট ছাড়তে হবে। সেই শর্ত পূরণ হলে জমিয়তও বিএনপির জোট ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির অবস্থান, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলনে ১১-দলীয় ঐক্যে থাকা যেতে পারে; একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনে কওমি ধারার দলগুলোর পৃথক জোটেও অংশ নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেন, একাধিক জোটে থাকার ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলনের জন্য ১১-দলীয় ঐক্যে থাকার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর নিজস্ব জোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। দলটির শর্ত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি ১১-দলীয় ঐক্য ছাড়লে তবেই তারা বিএনপির জোট ছাড়ার বিষয়ে বিবেচনা করবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান সমকালকে বলেন, সাতটি দলই দেওবন্দের আদর্শ অনুসরণ করে এবং সমমনা। তাই প্রথম লক্ষ্য স্থানীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা। তাঁর মতে, জোট হলে কোনো একক দল বা নেতার নেতৃত্ব থাকবে না; সাত দলের শীর্ষ নেতারাই সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব দেবেন।
হেফাজতে ইসলামীর ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, সংগঠনটি মূলত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই থাকবে; তাদের লক্ষ্য ইসলামপন্থি দলগুলোকে এক জায়গায় আনা।
জামায়াতের সিদ্ধান্তে নতুন সমীকরণ
জামায়াতের সঙ্গে কওমি ধারার দলগুলোর সম্পর্ক এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের কৌশল নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জামায়াতে ইসলামী এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাত দলের জোট গঠনের উদ্যোগ গতি পেয়েছে বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানিয়েছেন।
হেফাজতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে দেওবন্দি ধারার ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের চেষ্টা করছে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদির মতবাদের বিরোধিতাও এ উদ্যোগের অন্যতম প্রেক্ষাপট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির ও মহাসচিব জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত জুলাই ও সেপ্টেম্বরে হেফাজতের কার্যালয়ে সাত দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে দুই দফা বৈঠক হয়। ওই বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি কওমি ধারার দলগুলোর ঐক্যের পক্ষে মত দিলেও জামায়াতের জোট ছাড়ার শর্ত আরোপের বিষয়ে আপত্তি জানায়।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গত জানুয়ারিতে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় জামায়াতের জোট ছেড়ে যায়। দলটির দাবি ছিল, অন্তত ৮০টি আসন ছাড়তে হবে; তবে জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন দিতে রাজি হয়নি। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা অবশ্য দাবি করেন, শুধু আসন বণ্টন নয়, জামায়াত ইসলামের আদর্শ থেকে সরে যাওয়ায় তারা জোট ত্যাগ করেছেন।
অন্য দলকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা
বৈঠকে সাত দলের সম্ভাব্য জোটে এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে যুক্ত করার সুযোগ রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। আগামী ২৭ জানুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই নেতা জানান, জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তারা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য সাত দলের জোটে থাকার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলনে ১১-দলীয় ঐক্যের সঙ্গেও থাকবেন তাঁরা। এ লক্ষ্যে শুক্রবারের বৈঠক এবং ৩১ অক্টোবরের লংমার্চে অংশ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
পারস্পরিক সমালোচনা বন্ধের উদ্যোগ
জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকা নিয়ে কওমি ধারার বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও আলেমদের মধ্যে সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি বিভিন্ন বক্তব্যের মঞ্চেও দলগুলোর নেতাদের লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দেওবন্দি মতাদর্শ অনুসরণকারী দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারস্পরিক সমালোচনা পরিহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। গাজী আতাউর রহমানের ভাষ্য, দলগুলো বিচ্ছিন্নভাবে থাকায় ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে। ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব বিরোধ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান বজায় থাকবে। ইসলামী আন্দোলনসহ যারা সনদের পক্ষে রয়েছে, তারা এর বাস্তবায়নের দাবিতে নিজেদের অবস্থান অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, স্থানীয় নির্বাচনে সাত কওমি দলের জোটবদ্ধ অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রাথমিক অগ্রগতি হলেও জোটের চূড়ান্ত কাঠামো, নেতৃত্ব এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো বাকি। আগামী বৈঠকগুলোতে এসব প্রশ্নের সমাধানের ওপরই নতুন জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

