রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর

নিউজ ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে টোকিও। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়াকে এ সফরের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে জাপান।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২০ অক্টোবর দুই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর।

সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

ঢাকায় জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে তারা আশা করছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা, অভিন্ন সমৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হবে।

বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশে গুরুত্ব

জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের মতে, নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের উন্নতি হচ্ছে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত করা, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।

এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

এলএনজি টার্মিনাল ও টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা

সফরের সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার একটি কারখানাও পরিদর্শন করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করাও সফরের আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বিভিন্ন খাতে সমঝোতার সম্ভাবনা

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই কিংবা সহযোগিতার বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।

বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জোর জাপানের

জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, এ সফর বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত ও দূর করা, ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যেসব সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকার আসবে, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে টোকিও। জাপানের মতে, অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চলমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবং ব্যবসায়িক আস্থা জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপান। দেশটি বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন জাপানের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে।

২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের এ সফর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন