আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি আবার শুরু করেছে নেপাল। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ভারতের জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যায় নেপালের ত্রিশূলি ও চিলিমে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেন্দ্র দুটি থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন ছিল। বন্যার কারণে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানিও আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা জানান, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (সিইএ) অনুমোদনের পর বিকল্প জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় ‘সোলু খোলা’ ও ‘কাবেলি বি-১’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করবে নেপাল। অন্যদিকে, ‘লোয়ার মোদি খোলা’ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের হরিয়ানায় পাঠানো হবে। এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে আগে অনুমোদিত ত্রিশূলি, চিলিমে ও দেবীঘাট কেন্দ্রগুলোর পরিবর্তে নতুন প্রকল্পগুলো যুক্ত হয়েছে।
দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠার মতে, বন্যায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও দ্রুত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা এবং অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে রপ্তানি অব্যাহত রাখা নেপালের আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখবে।
পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তিতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ
বাংলাদেশে মৌসুমভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার কথা নেপালের।
ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানিতে নেপালের আয় বেড়েছে
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরুর পাশাপাশি ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানি থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় করেছে নেপাল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক মাসে দেশটি ভারতে ৫ দশমিক ৯২৫ বিলিয়ন রুপি বা ৫৯২ কোটি ৫০ লাখ রুপির বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি।
এনইএর লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য বলছে, ওই এক মাসে নেপাল ভারতে ৬৩৩ দশমিক ৯৮৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে। বন্যার কারণে কয়েকটি অনুমোদিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে পড়লেও রপ্তানি আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি।
গত বছরের একই সময়ে বিদ্যুৎ রপ্তানি থেকে নেপালের আয় ছিল ৪ দশমিক ৯৬৩ বিলিয়ন রুপি। সে হিসাবে এবার আয় বেড়েছে ৯৬২ মিলিয়ন রুপি। চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে আয় হয়েছিল ৫ দশমিক ০৯২৫ বিলিয়ন রুপি। সেই তুলনায় পরবর্তী এক মাসে আয় বেড়েছে ৮৩২ দশমিক ৫ মিলিয়ন রুপি।
দুই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ বিক্রি
নেপাল মূলত দুটি পদ্ধতিতে ভারতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় হরিয়ানা ও বিহার রাজ্যে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের (আইইএক্স) ডে-অ্যাহেড ও রিয়েল-টাইম বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করা হয়।
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করে নেপাল। মধ্যমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিবছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হরিয়ানা ও বিহারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নেপালের মোট বিদ্যুৎ রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ১৫১৩ বিলিয়ন রুপি বা ১ হাজার ৬১৫ কোটি ১৩ লাখ রুপি।
দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা জানান, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে রপ্তানি আয় বেড়েছে। এ সময়ে ভারতে সরবরাহ করা বিদ্যুতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় বিক্রি হয়েছে। বাকি বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়েছে ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে।

