অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানি, চোরাচালান ও অনুমোদনহীন বিক্রি বন্ধ করে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি রোধে জাতীয় যন্ত্রপাতি শনাক্তকরণ নিবন্ধন ব্যবস্থা (এনইআইআর) পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
প্রথম ধাপে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে বর্তমানে সচল থাকা হ্যান্ডসেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। পাশাপাশি অনুমোদিত আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদকদের কাছে থাকা অবিক্রীত ফোনের আইএমইআই নম্বরের তথ্যও নিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত করা হবে।
পরবর্তী ধাপে হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত, ফোনের মালিকানা যাচাই এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) জালিয়াতি প্রতিরোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এ তথ্য জানিয়েছে।
বছরে রাজস্ব ফাঁকি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মূল্যায়ন অনুযায়ী, অবৈধ মোবাইল ফোনের কারণে সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বিটিআরসির কমিশন সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্রেও এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপে এনইআইআরের মূল কার্যক্রম চালু করা হলেও হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হবে না। তবে বিদেশ থেকে অবৈধভাবে আনা, চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করা এবং শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে বাজারজাত করা ফোন শনাক্ত ও বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা কার্যকর হলে ফোনের মালিকানা যাচাই এবং একই আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করা ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবায় জালিয়াতি প্রতিরোধেও ব্যবস্থাটি সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আগের উদ্যোগে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি ব্যবস্থা
বিটিআরসির কমিশন সভায় সংস্থাটির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক এনইআইআর পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি বিস্তারিত কার্যপত্র উপস্থাপন করেন।
কার্যপত্রে বলা হয়, ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থা চালুর পর তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো চালু করা হয়নি। ফলে এনইআইআর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে বিটিআরসির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। দুই ধাপে ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সরকারের পূর্বানুমোদন পেতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে।
বিভিন্ন সময়ে পূর্ণাঙ্গ চালুর সুপারিশ
অবৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ এবং টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর তাগিদ দিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর এনবিআর অবৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে বিটিআরসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরে ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ব্যবস্থাটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনায় প্রাথমিক অনুমোদন দেয়।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় দেশের সব মোবাইল নেটওয়ার্কে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি থাকলেও জনভোগান্তি এড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফোন বন্ধ করার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো কার্যকর করা হয়নি।
এরপর ২০২৬ সালের ৯ জুন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিক চিঠিতে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয় তুলে ধরে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। একই বছরের ২ জুলাই আইএমইআই, সিম নিবন্ধন ও মোবাইল আর্থিক সেবায় জালিয়াতির ঝুঁকি নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায়ও ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর সুপারিশ করা হয়।
সর্বশেষ ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ওই সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এনইআইআর চালুর সুপারিশ করা হয়।
চুরি ও আর্থিক জালিয়াতি ঠেকানোর লক্ষ্য
সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, অনিবন্ধিত, চোরাই ও ক্লোন হ্যান্ডসেট সংঘবদ্ধ অপরাধ, মোবাইল ফোন চুরি এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রতিটি যন্ত্রের পরিচয় শনাক্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
এনইআইআরের মাধ্যমে হ্যান্ডসেটের পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর হলে অবৈধ ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধে ব্যবহৃত ফোন শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৯ সালের মধ্যে বন্ধ হবে ২জি ফোনের ব্যবহার
এদিকে, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শুধু দ্বিতীয় প্রজন্মের (২জি) নেটওয়ার্ক-সমর্থিত মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধে পর্যায়ক্রমিক রূপরেখাও অনুমোদন করেছে বিটিআরসি।
এ পরিকল্পনার আওতায় ২জি ফোনের অনুমোদন, উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।

