রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

নগরে দূষণের শিকার গাছ, ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য

নিউজ ডেস্ক

নগরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বায়ুদূষণ, যানবাহনের ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরের গাছপালা। পাতায় জমছে ধুলার স্তর, বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে লতাপাতা, ব্যাহত হচ্ছে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি। এর সঙ্গে কংক্রিটের বিস্তার ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শিকড়ের বিকাশ এবং মাটিতে পানি প্রবেশের সুযোগও কমে আসছে।

কোথাও গাছের শিকড়ের আশপাশে জমছে দূষিত পানি ও বর্জ্য। কোথাও পর্যাপ্ত মাটি না থাকায় শিকড় ছড়াতে পারছে না। সব মিলিয়ে নগরের গাছের অস্তিত্ব ও সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয় ও খাদ্যের জোগানও দেয়। গাছের ডালে পাখি বাসা বাঁধে, ফুলে মৌমাছি ও প্রজাপতির বিচরণ ঘটে, আর ফলের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে বীজ। প্রকৃতির এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে গাছের ক্ষতি মানে শুধু সবুজ কমে যাওয়া নয়, বরং নগরের বাস্তুতন্ত্রও ঝুঁকির মুখে পড়া।

দূষণ ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে নগরের অনেক গাছে পাখির আনাগোনা কমে যাচ্ছে। কোথাও কমছে ফুল ও ফলের পরিমাণ, ব্যাহত হচ্ছে প্রাণীদের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের গাছ রক্ষায় শুধু বৃক্ষরোপণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, গাছ অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি কার্বন শোষণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু ধুলাবালি ও দূষণের প্রভাব থেকে গাছকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি।

তিনি বলেন, “কমিউনিটি বেসড প্রটেকশন সিস্টেম” গড়ে তুলতে পারলে গাছ রক্ষা করা সম্ভব হবে। গাছ বাঁচলে পশুপাখি টিকে থাকবে, আর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও।

নগরে গাছের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পরিকল্পনার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন নিসর্গবিদ ও লেখক মোকারম হোসেন। তিনি বলেন, গাছকে ঘিরে প্রাণীবৈচিত্র্যের ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। যথাযথ পরিচর্যার অভাবে গাছ ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এতে পোকামাকড় ও পাখির খাদ্যের উৎসও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাঁর মতে, নগরে বেজি, কাঠবিড়ালি ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি কমে যাওয়ার পেছনেও আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট ভূমিকা রাখছে।

বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো এবং রোপণের পর যথাযথ পরিচর্যা না করা হলে প্রত্যাশিত পরিবেশগত সুফল পাওয়া কঠিন। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে, শিকড় বিস্তারের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হবে কি না এবং গাছের পানি ও পুষ্টির চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগের সফলতাও নির্ভর করবে রোপণের পর সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল ইসলাম খান দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৃক্ষবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, একটি গাছকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। মাটির সঙ্গে গাছের সংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পানিও দিতে হবে। নগরের নান্দনিকতা, প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নতুন করে ম্যাপিংয়ের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

নগরের পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি গাছের সুস্থ বৃদ্ধি, প্রাণীদের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সমন্বিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু গাছ লাগিয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন