রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

টাইম ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে কী বলা হয়েছে?

নিউজ ডেস্ক

পবিত্র কোরআনে সময়ের গুরুত্ব, মানুষের জীবনযাপন, ইবাদত ও কর্মের বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা এসেছে। কোরআনের সুরা আসর শুরু হয়েছে সময়ের শপথ দিয়ে। এ সুরায় বলা হয়েছে, মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে, তারা এর ব্যতিক্রম।

এ ছাড়া সুরা ফজর, সুরা লাইল ও সুরা দুহাসহ কয়েকটি সুরার শুরুতে দিনের বা রাতের বিশেষ সময়ের শপথ করা হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাত ও দিনকে সময়ের হিসাব নির্ধারণের উপায় হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায়, জীবিকা অন্বেষণ এবং কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সময় সম্পর্কে সুরা আসরের শিক্ষা

সুরা আসরের প্রথম তিন আয়াতের অর্থ হলো—‘সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’

এই সুরায় মানুষের সফলতার জন্য চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে—ঈমান, সৎকাজ, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়া এবং ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া। আয়াতগুলোতে মানুষের জীবনে সময়ের গুরুত্ব এবং সঠিক পথে থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

তাফসির ইবনে কাসিরে ‘আসর’ শব্দের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন মত উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ব্যাখ্যায় আসর বলতে এমন সময়কে বোঝানো হয়েছে, যখন মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়—তা ভালো হোক কিংবা মন্দ। অন্য একটি বর্ণনায় মালিক ইবনে আনাস, যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে আসর বলতে সন্ধ্যাকাল বোঝানোর কথা উল্লেখ করেছেন। তাফসিরে সময়ের ব্যাপক অর্থসংক্রান্ত ব্যাখ্যাটি অধিক পরিচিত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সুরাটির ব্যাখ্যায় ক্ষতি বলতে লোকসান ও ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। আর পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়ার অর্থ হিসেবে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজের প্রতি উৎসাহিত করা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

সুরা আসরের গুরুত্ব বোঝাতে তাফসিরে ইমাম শাফেয়ির একটি বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ যদি এই সুরা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত, তবে এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।

এ ছাড়া তাবারানিতে আবদুল্লাহ ইবনে হুসন আবু মদিনার সূত্রে একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবিদের দুজনের সাক্ষাৎ হলে তাঁরা বিদায়ের আগে পরস্পরকে সুরা আসর পড়ে শোনাতেন এবং সালাম বিনিময় করতেন।

দিনের ও রাতের বিশেষ সময়ের শপথ

সুরা আসরের মতো কোরআনের আরও কয়েকটি সুরার শুরুতে দিনের বা রাতের বিশেষ সময়ের শপথ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুরা ফজর, সুরা লাইল ও সুরা দুহা।

সুরা ফজর: এই সুরার প্রথম দুই আয়াতে ভোরবেলা এবং দশ রাতের শপথ করা হয়েছে। আয়াতগুলোতে সময়ের বিশেষ পর্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

সুরা লাইল: এ সুরায় রাতের শপথ করা হয়েছে, যখন তা চারপাশকে আচ্ছন্ন করে। পাশাপাশি দিনের শপথ করা হয়েছে, যখন তা প্রকাশিত হয়।

সুরা দুহা: সুরাটির শুরুতে পূর্বাহ্নের উজ্জ্বল আলোর এবং রাতের শপথ করা হয়েছে, যখন তা অন্ধকারে ঢেকে যায়।

এসব আয়াতে রাত ও দিনের বিভিন্ন পর্যায়ের উল্লেখের মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন এবং সেগুলো নিয়ে চিন্তা করার বিষয়টি সামনে এসেছে।

সময়ের হিসাব নির্ধারণে রাত ও দিনের ভূমিকা

কোরআনে রাত ও দিনের আবর্তন এবং সূর্য ও চাঁদের গতিপথকে সময়ের হিসাব নির্ধারণের উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুরা ইসরার ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ রাত ও দিনকে দুটি নিদর্শন করেছেন। রাতের নিদর্শনকে মুছে দিয়ে দিনের নিদর্শনকে দৃশ্যমান করেছেন, যাতে মানুষ তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারে এবং বছরের সংখ্যা ও সময়ের হিসাব জানতে পারে।

সুরা ইউনুসের ৫ নম্বর আয়াতেও সূর্য ও চাঁদের প্রসঙ্গে সময় গণনার বিষয়টি এসেছে। আয়াতটিতে সূর্যকে উজ্জ্বল আলোকময় এবং চাঁদকে আলোকময় করার কথা উল্লেখ করে চাঁদের বিভিন্ন মনজিল নির্ধারণের উদ্দেশ্য হিসেবে বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, সুরা নাবার ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে রাতকে আবরণ এবং দিনকে জীবিকা অর্জনের সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা ফুরকানের ৬২ নম্বর আয়াতে রাত ও দিনের পরস্পরের পরপর আগমনকে উপদেশ গ্রহণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আগ্রহীদের জন্য একটি নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশনা

কোরআনে ইবাদতের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা নিসার ১০৩ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ করা হয়েছে।

সুরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েমের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা ইসরার ৭৮ নম্বর আয়াতে সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম এবং ফজরের কোরআন তিলাওয়াতের কথা বলা হয়েছে। আয়াতটিতে ফজরের তিলাওয়াত প্রত্যক্ষ হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।

সুরা ত্বহার ১৩০ নম্বর আয়াতে ধৈর্য ধারণের নির্দেশনার পাশাপাশি সূর্যোদয়ের আগে, সূর্যাস্তের আগে, রাতের বিভিন্ন সময়ে এবং দিনের প্রান্তভাগে আল্লাহর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করতে বলা হয়েছে।

এসব আয়াতে দিনের বিভিন্ন সময়ের সঙ্গে ইবাদতের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতগুলোর সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়ের সম্পর্ক এবং সেগুলোর বিস্তারিত বিধান নিয়ে মুফাসসিররা ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

কাজ, জীবিকা ও অবসর সম্পর্কে নির্দেশনা

কোরআনে ইবাদতের পাশাপাশি জীবিকা অর্জন, কাজ এবং অবসর সময়ের ব্যবহার সম্পর্কেও নির্দেশনা রয়েছে।

সুরা জুমার ৯ নম্বর আয়াতে জুমার দিনে নামাজের আজান দেওয়া হলে আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হতে এবং বেচাকেনা ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। পরের আয়াতে নামাজ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে এবং তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুরা ইনশিরাহর ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অতএব, যখন তুমি অবসর পাও, তখন পরিশ্রম করো।’ আয়াতটির ব্যাখ্যায় একটি কাজ শেষ হলে অন্য কাজে আত্মনিয়োগ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কোরআনে নির্দেশনা এসেছে। সুরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে পরামর্শের প্রসঙ্গে মহানবীকে (সা.) সম্বোধন করে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।

সময়ের সদ্ব্যবহার ও জীবনের দায়িত্ব

কোরআনের এসব আয়াত থেকে সময়, ইবাদত, সৎকাজ, জীবিকা এবং মানুষের পারস্পরিক দায়িত্বের বিভিন্ন দিক উঠে আসে। সুরা আসর ঈমান, সৎকাজ, সত্যের উপদেশ ও ধৈর্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। অন্যদিকে, রাত-দিনের আবর্তন, সূর্য ও চাঁদের গতিপথ এবং নির্ধারিত সময়ে ইবাদতের নির্দেশনা মানুষের জীবনে সময়ের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দেয়।

এসব আয়াতের আলোকে সময়কে দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগানো, ইবাদতের প্রতি যত্নশীল হওয়া, জীবিকা অর্জনে চেষ্টা করা এবং সত্য ও ধৈর্যের পথে একে অন্যকে সহযোগিতা করার শিক্ষা পাওয়া যায়।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন