রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

পাকস্থলীর ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

নিউজ ডেস্ক

পাকস্থলী ও গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল জংশন (জিইজে) ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পরীক্ষামূলক ওষুধ সোনেসিতাতুগ ভেডোটিন প্রয়োগে উন্নত পর্যায়ের পাকস্থলী ও জিইজে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যম সামগ্রিক বেঁচে থাকার সময় পাঁচ মাস থেকে বেড়ে ১০ মাস হয়েছে। প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় ওষুধটি রোগীদের মৃত্যুঝুঁকিও কমিয়েছে বলে তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকস্থলীর ক্যানসার বিশ্বজুড়েই চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। রোগটি অনেক সময় উন্নত পর্যায়ে শনাক্ত হয়, যখন অস্ত্রোপচারের সুযোগ সীমিত হয়ে আসে। প্রাথমিক কেমোথেরাপিতে কাজ না হলে চিকিৎসার বিকল্পও কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট প্রোটিনকে লক্ষ্য করে তৈরি নতুন ওষুধটি উন্নত পর্যায়ের ক্যানসার চিকিৎসায় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে

CLARITY-Gastric01 নামের তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ৫৩২ জন রোগী অংশ নেন। তাঁদের পাকস্থলী, জিইজে অথবা খাদ্যনালির অ্যাডেনোকারসিনোমা স্থানীয়ভাবে অগ্রসর কিংবা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া পর্যায়ে ছিল। রোগীদের টিউমারে ক্লডিন ১৮.২ (CLDN18.2) নামের একটি বায়োমার্কার উপস্থিত ছিল এবং আগের চিকিৎসার পরও তাঁদের রোগের অগ্রগতি ঘটেছিল।

পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, সোনেসিতাতুগ ভেডোটিন গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যম সামগ্রিক বেঁচে থাকার সময় ছিল ১০ মাস। অন্যদিকে, চিকিৎসকের পছন্দ অনুযায়ী প্রচলিত দ্বিতীয় ধাপের কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে তা ছিল পাঁচ মাস।

গবেষণায় পরীক্ষামূলক ওষুধটি মৃত্যুঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হ্যাজার্ড রেশিও ছিল ০.৫৮। প্রতিবেদনে ফলাফলটিকে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ওষুধটি রোগের অগ্রগতি ছাড়া বেঁচে থাকার সময় বা প্রগ্রেশন-ফ্রি সারভাইভাল (পিএফএস) নিয়ে পরীক্ষার দ্বিতীয় লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ফলে সামগ্রিক বেঁচে থাকার সময় বাড়ানোর ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে ওষুধটির কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।

কীভাবে কাজ করে নতুন ওষুধ

সোনেসিতাতুগ ভেডোটিন একটি পরীক্ষামূলক অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট (এডিসি)। এ ধরনের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে সক্ষম অ্যান্টিবডির সঙ্গে ক্যানসারবিরোধী ওষুধ যুক্ত করা হয়।

নতুন ওষুধটির লক্ষ্য হলো টিউমার কোষের পৃষ্ঠে থাকা CLDN18.2 প্রোটিন। এই প্রোটিনকে শনাক্ত করে ওষুধটি টিউমার কোষের কাছে কোষবিধ্বংসী উপাদান পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কাজ করে। এর মাধ্যমে ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে আশপাশের সুস্থ কোষের ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা এই পদ্ধতিতে নেই।

কম বায়োমার্কার থাকলেও চিকিৎসার সম্ভাবনা

পরীক্ষাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, টিউমারে CLDN18.2 বায়োমার্কারের উপস্থিতি তুলনামূলক কম—এমন রোগীদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বায়োমার্কারটির উপস্থিতি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম হলেও রোগীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল।

বর্তমানে অনুমোদিত কিছু CLDN18.2-লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসায় টিউমার কোষের অন্তত ৭৫ শতাংশে এই বায়োমার্কারের উপস্থিতির মতো উচ্চ সীমা প্রয়োজন হয়। নতুন ওষুধটি কার্যকর প্রমাণিত হলে তুলনামূলক কম মাত্রায় বায়োমার্কার থাকা রোগীদের জন্যও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে উপযুক্ত রোগী শনাক্ত করতে টিউমারের বায়োমার্কার পরীক্ষা এবং ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই চিকিৎসকেরা নির্ধারণ করতে পারেন, কোনো রোগী নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার উপযুক্ত কি না।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা

পরীক্ষায় সোনেসিতাতুগ ভেডোটিন গ্রহণকারী রোগীদের ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট তৃতীয় বা তার চেয়ে গুরুতর মাত্রার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রচলিত কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

তবে শুধু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার তুলনা করেই ওষুধটির সামগ্রিক নিরাপত্তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন, চিকিৎসা বন্ধের প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার তথ্যও বিবেচনা করতে হবে।

বিশেষ করে, পরীক্ষাটিতে রোগের অগ্রগতি ছাড়া বেঁচে থাকার সময়সংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় চিকিৎসাটির সামগ্রিক সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আরও বিশদভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ক্যানসার চিকিৎসায় পরবর্তী পদক্ষেপ

পাকস্থলীর ক্যানসার অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই অগ্রসর হতে পারে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় অস্ত্রোপচারের সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বায়োমার্কার-নির্ভর চিকিৎসা নির্দিষ্ট রোগীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার অনকোলজি গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট সুসান গ্যালব্রেইথের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠিন চিকিৎসাযোগ্য উন্নত পর্যায়ের পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যম বেঁচে থাকার সময় পাঁচ মাস বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আসন্ন একটি চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলনে পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ তথ্য উপস্থাপন এবং বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে ফলাফল জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে ওষুধটির সুফল কোন ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, দীর্ঘমেয়াদে এর নিরাপত্তা কেমন এবং বাস্তব চিকিৎসাব্যবস্থায় এটি কতটা কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তথ্য প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও চিকিৎসার প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই রোগীদের জন্য এর বাস্তব সুফল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় মধ্যম বেঁচে থাকার সময় দ্বিগুণ হওয়ার ফলাফল উন্নত পর্যায়ের পাকস্থলীর ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক ওষুধ; তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এটি বিবেচনা করা উচিত নয়।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন