ওয়েবসাইট তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ত্রুটি দুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা আক্রান্ত সার্ভারে দূর থেকে অননুমোদিত নির্দেশনা চালানো, তথ্য চুরি কিংবা ক্ষতিকর সফটওয়্যার স্থাপনের সুযোগ পেতে পারেন। ইন্টারনেটের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহৃত হওয়ায় এ দুর্বলতার প্রভাব ব্যাপক হওয়ার আশঙ্কা করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার ‘পিএইচপি২শেল’ নামে পরিচিত দুটি নিরাপত্তাত্রুটি প্রকাশ্যে আসে। ত্রুটি দুটির শনাক্তকরণ নম্বর যথাক্রমে CVE-2026-109618 ও CVE-2026-109619। এগুলো সংশোধনে নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশ করেছে পিএইচপি ফাউন্ডেশন। তবে সব সার্ভারে এখনো হালনাগাদ ইনস্টল না হওয়ায় ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে নিরাপত্তাত্রুটি
পিএইচপি একটি মুক্ত উৎসের প্রোগ্রামিং ভাষা, যা ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ওয়ার্ডপ্রেস, ড্রুপাল ও জুমলার মতো জনপ্রিয় ওয়েব প্ল্যাটফর্মেও ভাষাটির ব্যবহার রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ত্রুটি দুটি প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে তখন সেগুলো কাজে লাগিয়ে কার্যকরভাবে হামলা চালানোর পদ্ধতি জানা ছিল না। সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা ত্রুটি দুটি কাজে লাগানোর কৌশল বের করেন। পরে বিষয়টি পিএইচপি ফাউন্ডেশনকে জানানো হলে দুর্বলতা সংশোধনে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ত্রুটি দুটির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো, আক্রমণের জন্য ব্যবহারকারীকে কোনো সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা বা ফাইল খুলতে প্রলুব্ধ করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। আক্রান্ত সার্ভারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ না থাকলে দূর থেকেই সেখানে ক্ষতিকর নির্দেশনা চালানো সম্ভব হতে পারে। সাইবার নিরাপত্তার পরিভাষায় এ ধরনের আক্রমণকে বলা হয় ‘রিমোট কোড এক্সিকিউশন’।
এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা সার্ভারে ক্ষতিকর সফটওয়্যার স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি কিংবা ভবিষ্যতে আবার প্রবেশের জন্য গোপন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন। ফলে শুধু ওয়েবসাইটের তথ্য নয়, সংশ্লিষ্ট সার্ভারে সংরক্ষিত অন্যান্য তথ্য ও সেবাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় শনাক্ত
ক্যালিফ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা গবেষকেরা পিএইচপির কোড পর্যালোচনার সময় ত্রুটি দুটি শনাক্ত করেন। তাঁরা ওপেনএআই ও ক্লাউড নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের ‘হ্যাক দ্য প্ল্যানেট’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে কাজ করছিলেন। পরে ওপেনএআই ত্রুটিগুলো কাজে লাগানোর পরীক্ষামূলক পদ্ধতি যাচাই করে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্বলতাগুলো কাজে লাগানোর প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। তবে পুরো কাজটি কেবল এআইনির্ভর ছিল না। গবেষকদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, পিএইচপির কোড সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং অতীতের সাইবার হামলার কৌশল সম্পর্কে ধারণাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে, নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশের আগেই ত্রুটিগুলো ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে অ্যামাজন। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে ১৭ অক্টোবরের দিকে এ ধরনের সন্দেহজনক কার্যকলাপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে হামলাকারীরা কীভাবে দুর্বলতার তথ্য পেয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হামলার প্রমাণ, তবে আক্রান্তদের পরিচয় অজানা
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান পালো অল্টো নেটওয়ার্কস ও ট্রেইল অব বিটসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের মধ্যে ত্রুটি দুটি কাজে লাগিয়ে অনুপ্রবেশ এবং পরবর্তী ক্ষতিকর কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে তখন পর্যন্ত আক্রান্ত সার্ভার বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ছোট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগতভাবে ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীরা সময়মতো সফটওয়্যার হালনাগাদ না করায় তাঁদের সার্ভারগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে। শুধু ওয়েব সার্ভার নয়, বিভিন্ন উন্নয়ন সরঞ্জাম, নেটওয়ার্ক যন্ত্র এবং নিরাপত্তা পণ্যেও পিএইচপির সংশ্লিষ্ট উপাদান ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে ঝুঁকি নিরূপণের ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ওয়েবসাইট নিরাপদ রাখতে করণীয়
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পিএইচপি ব্যবহারকারী ওয়েবসাইট ও সার্ভারের পরিচালকদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি সার্ভারের লগ পরীক্ষা করে অননুমোদিত প্রবেশ, অস্বাভাবিক কার্যকলাপ কিংবা ক্ষতিকর সফটওয়্যার স্থাপনের লক্ষণ খুঁজে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
পুরোনো সফটওয়্যার বা প্রযুক্তির কারণে সরাসরি হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সার্ভারে ব্যবহৃত অন্যান্য সফটওয়্যার ও উপাদানেও একই ধরনের দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি একদিকে পুরোনো সফটওয়্যারে থাকা নিরাপত্তা দুর্বলতার ঝুঁকি তুলে ধরেছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নতুন ত্রুটি শনাক্ত ও পরীক্ষা করার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতাও সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের সাইবার হামলা ঠেকাতে নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, দ্রুত সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং সার্ভারের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

