রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

স্মার্ট মিটার-জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে চায় চীন

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশের স্মার্ট মিটার ও স্মার্ট এনার্জি খাতে বিনিয়োগের প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান শেনজেন কাইফা টেকনোলজি (চেংদু) কোম্পানি লিমিটেড। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ কর্মসূচির আওতায় দেশে স্মার্ট মিটার উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাজারে পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্বাক্ষরিত বিনিয়োগের আগ্রহপত্রে (লেটার অব ইনটেন্ট) এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্মার্ট মিটারিং ও স্মার্ট এনার্জি খাতে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিনিয়োগের কর্মসূচি বিবেচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এটি প্রাথমিক আগ্রহপত্র। বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রকল্পের পরিধি ও বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, নীতিগত পরিবর্তন, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা, যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং বাংলাদেশ ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।

উৎপাদন থেকে গবেষণা ও উন্নয়ন

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সেমি-নকড ডাউন (এসকেডি) পদ্ধতিতে স্মার্ট মিটার সংযোজনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে কমপ্লিটলি নকড ডাউন (সিকেডি) পদ্ধতিতে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ জন্য সারফেস মাউন্ট টেকনোলজি (এসএমটি), প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি) এবং যোগাযোগ মডিউল নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্মার্ট মিটার উৎপাদনে স্থানীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রস্তাবে বাংলাদেশের জাতীয় অ্যাডভান্সড মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার (এএমআই) প্ল্যাটফর্মের জন্য কেন্দ্রীয় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

শুধু বিদ্যুতের স্মার্ট মিটার নয়, পানি ও গ্যাসের স্মার্ট মিটার উৎপাদনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি স্বীকৃত আঞ্চলিক মিটার পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী পর্যায়ে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

স্মার্ট এনার্জি ও দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা

স্মার্ট মিটারিংয়ের বাইরেও বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থাপনা, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) এবং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইএমএস) নিয়ে স্থানীয় গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া স্মার্ট এনার্জি ও উৎপাদন খাতের জন্য দক্ষ বিশেষজ্ঞ তৈরিতে একটি কারিগরি একাডেমি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে স্মার্ট মিটার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য সুফল নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের অগ্রগতির ওপর।

বিদ্যুৎ খাতে কী সুফল মিলতে পারে

প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, সিস্টেমের ক্ষতি কমানো এবং বিতরণকারী সংস্থাগুলোর রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আগ্রহপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্মার্ট মিটার ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে মিটার উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় শিল্পের সহায়ক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে এসব সুফল কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয়ের ওপর।

৪০টির বেশি দেশে স্মার্ট মিটার সরবরাহের দাবি

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ৩০ বছরের বেশি গবেষণা ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের জন্য ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর মিটারিং সমাধান তৈরি করে।

আগ্রহপত্রে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ১০ কোটি ৭০ লাখের বেশি স্মার্ট মিটার ও সংশ্লিষ্ট অ্যাডভান্সড মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার (এএমআই) সমাধান সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি ৮০টির বেশি ইউটিলিটি সংস্থাকে সেবা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় স্মার্ট এনার্জি শিল্পে সহযোগিতা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং বাংলাদেশ-চীন যৌথ ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।

অনুমোদন ও বাস্তবায়নই এখন গুরুত্বপূর্ণ

বিনিয়োগের আগ্রহপত্রে বাংলাদেশের প্রযোজ্য আইন, বিনিয়োগনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে প্রকল্পটির বিনিয়োগ-যোগ্যতা, অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ, প্রণোদনা এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

তবে আগ্রহপত্রে বিনিয়োগের নির্দিষ্ট পরিমাণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা, সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সংখ্যা, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কিংবা অর্থায়নের বিস্তারিত কাঠামো উল্লেখ করা হয়নি।

ফলে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত বিনিয়োগ চুক্তিতে রূপ নেয় কি না এবং বাস্তবে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের প্রকৃত পরিমাণ, স্থানীয় উৎপাদনে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাত্রা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও স্মার্ট এনার্জি খাতে এর অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা যাবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন