শীত এলেই ত্বক হয়ে ওঠে রুক্ষ, খসখসে ও টানটান। ঠোঁট ফাটা, হাত-পায়ের চামড়া শুষ্ক হয়ে যাওয়া কিংবা গোড়ালি ফাটার মতো সমস্যাও দেখা দেয় এ সময়। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে তাই শীতকালীন পরিচর্যায় ময়েশ্চারাইজার হয়ে ওঠে অপরিহার্য। বাজারে নানা ধরনের লোশন, ক্রিম ও সিরাম পাওয়া গেলেও দীর্ঘদিন ধরে ত্বকের যত্নে জনপ্রিয় দুটি উপাদান হলো পেট্রোলিয়াম জেলি বা ভ্যাসলিন এবং গ্লিসারিন।
কিন্তু শীতকালে ত্বকের যত্নে কোনটি বেশি কার্যকর—ভ্যাসলিন, নাকি গ্লিসারিন? বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটির কাজের ধরন আলাদা। তাই ত্বকের ধরন ও প্রয়োজন বুঝে ব্যবহার করলেই মিলতে পারে ভালো ফল।
ভ্যাসলিন ও গ্লিসারিনের কাজ কী?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শ্বেতা ত্রিপাঠি বলেন, গ্লিসারিন ও ভ্যাসলিনকে আলাদা উপাদান হিসেবে না দেখে একসঙ্গে কাজ করা দুটি উপাদান হিসেবে ভাবা যেতে পারে। গ্লিসারিন ত্বকে আর্দ্রতা টেনে আনতে সাহায্য করে, আর ভ্যাসলিন সেই আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
ভ্যাসলিন: ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে
পেট্রোলিয়াম জেলি ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে। এটি সরাসরি ত্বকে পানি যোগ করার বদলে ত্বক থেকে আর্দ্রতা বেরিয়ে যাওয়ার হার কমায়। ফলে ত্বক নরম রাখতে এবং শুষ্কতা থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
ঠোঁট ফাটা, গোড়ালি ও কনুইয়ের রুক্ষতা কিংবা হাত-পায়ের অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বকে ভ্যাসলিন উপকারী হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান বা ত্বকের চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যাতেও এটি ব্যবহার করা হয়।
অসুবিধা: ভ্যাসলিন তুলনামূলক ঘন ও তেলতেলে। তাই কেউ কেউ মুখে বা শরীরে ব্যবহারের পর ভারী অনুভব করতে পারেন।
গ্লিসারিন: ত্বকে আর্দ্রতা টানতে সাহায্য করে
গ্লিসারিন একটি হিউমেকট্যান্ট, অর্থাৎ এটি পানি আকর্ষণ করে ত্বকের বাইরের স্তরে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে ত্বক নরম ও মসৃণ থাকে এবং শুষ্কতার অনুভূতি কমতে পারে।
গ্লিসারিন বিভিন্ন ময়েশ্চারাইজার, লোশন ও ক্রিমের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উপযুক্ত ফর্মুলেশনে এটি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে কার্যকর।
অসুবিধা: ঘন বা বিশুদ্ধ গ্লিসারিন সরাসরি ব্যবহার করলে কারও কারও ত্বকে জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি হতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ায় শুধু গ্লিসারিনের ওপর নির্ভর না করে উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজারের সঙ্গে ব্যবহার করা ভালো।
শীতে কোনটি বেশি কার্যকর?
শীতকালে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ঠিক রাখা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। গ্লিসারিন ত্বকের বাইরের স্তরে আর্দ্রতা টানতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ভ্যাসলিন সেই আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যাওয়া কমায়।
এ কারণে অনেকের জন্য দুটি উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার করা উপকারী হতে পারে। প্রথমে গ্লিসারিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী শুষ্ক অংশে অল্প ভ্যাসলিন ব্যবহার করা যায়। গোসলের পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগালে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সুবিধা হয়।
ত্বকের যত্নে ভ্যাসলিনের ওপর ময়েশ্চারাইজার দিয়ে আর্দ্রতা আটকে রাখার পদ্ধতিকে ‘স্লাগিং’ বলা হয়। তবে সবার ত্বকের জন্য এই পদ্ধতি উপযুক্ত নয়; বিশেষ করে মুখে ব্রণ বা ফলিকুলাইটিসের প্রবণতা থাকলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বকে কোনটি ভালো?
তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য হালকা, সুগন্ধিবিহীন এবং ‘নন-কমেডোজেনিক’ হিসেবে চিহ্নিত ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া যেতে পারে। গ্লিসারিন সাধারণত এ ধরনের পণ্যে ব্যবহৃত হয় এবং নিজে সাধারণত রোমকূপ বন্ধ করে না।
ভ্যাসলিনকে সাধারণভাবে রোমকূপ বন্ধকারী উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তবে মুখে ঘন স্তর হিসেবে ব্যবহার করলে কারও কারও অস্বস্তি হতে পারে। তাই ত্বকের প্রতিক্রিয়া বুঝে ব্যবহার করা ভালো।
সংবেদনশীল বা একজিমাপ্রবণ ত্বকে কী করবেন?
সংবেদনশীল ও শুষ্ক ত্বকে সুগন্ধিবিহীন ভ্যাসলিন আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে সব ধরনের ত্বকের সমস্যা বা একজিমার চিকিৎসা হিসেবে এটিকে একমাত্র সমাধান ভাবা ঠিক নয়।
গ্লিসারিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজারও উপকারী হতে পারে। তবে ত্বকে জ্বালাপোড়া, চুলকানি বা লালচে ভাব দেখা দিলে পণ্যটির ব্যবহার বন্ধ করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কনকনে শীতে কোনটি বেছে নেবেন?
শীতের বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকলে ত্বক থেকে পানি হারানোর প্রবণতা বাড়তে পারে। এ সময় শুধু গ্লিসারিন ব্যবহার না করে ময়েশ্চারাইজারের মাধ্যমে ত্বকে আর্দ্রতা যোগ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যাসলিনের মতো সুরক্ষামূলক উপাদান ব্যবহার করা কার্যকর হতে পারে।
তবে ভ্যাসলিন ব্যবহারের আগে ত্বক পরিষ্কার রাখা এবং অতিরিক্ত ঘন স্তর না লাগানো ভালো। ত্বকে ক্ষত, সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তাহলে শীতে সেরা কোনটি—ভ্যাসলিন, নাকি গ্লিসারিন?
এককভাবে কোনো একটিকে সবার জন্য সেরা বলা যায় না। ত্বকের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী দুটির কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে।
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে: ভ্যাসলিন উপকারী।
ত্বকের বাইরের স্তরে আর্দ্রতা টানতে: গ্লিসারিন কার্যকর।
অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বকে: গ্লিসারিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজারের পর প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প ভ্যাসলিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বকে: হালকা, নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া ভালো।
সবশেষে, ত্বকের যত্নে দামি পণ্য ব্যবহার করাই মূল বিষয় নয়; বরং ত্বকের প্রয়োজন বুঝে সঠিক উপাদান বেছে নেওয়া জরুরি। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, অতিরিক্ত গরম পানি এড়িয়ে চলা এবং ত্বকের অস্বাভাবিক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শীতকালীন ত্বকের যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

