রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জাপান সফর শেষ করে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা

নিউজ ডেস্ক

জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করেন তিনি। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইটটি জাপানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে।

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এই সফরে যান তারেক রহমান। সফরকালে তিনি জাপানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। পাশাপাশি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, জ্বালানি ও লজিস্টিকস অবকাঠামো পরিদর্শন করেন।

এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক। এতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে জাপানি একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করে।

সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া মোট ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দুটি ঋণসহায়তা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।

চুক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান সহায়তার বিষয়টিও রয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহযোগিতার জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছে একটি আগ্রহপত্র বা ‘লেটার অব ইনটেন্ট’।

এ ছাড়া ঋণসহায়তার আওতায় নেওয়া দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং উপজেলা শাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়া হবে।

বেসরকারি খাতেও ১৭টি সমঝোতা স্মারক

সরকারি পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) উদ্যোগে দুই দেশের বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

গত ২৮ অক্টোবর টোকিওতে জেট্রোর সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

খাতগুলো হলো—অটোমোবাইল উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ, উচ্চগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। এসব খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সরকারি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেন প্রধানমন্ত্রী।

জাপানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক

সফরকালে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান।

এ ছাড়া পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো করপোরেশন এবং জেরা-সহ জাপানের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

জ্বালানি ও অটোমোবাইল অবকাঠামো পরিদর্শন

জাপানের শিল্প ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা সরেজমিনে দেখতে সফরসূচিতে একাধিক পরিদর্শন কর্মসূচি রাখা হয়। গত ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ফুত্তসুতে অবস্থিত জেরা প্রতিষ্ঠানের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। একই দিন ইচিকাওয়াতে অবস্থিত নিতসু লজিস্টিকস হাবও ঘুরে দেখেন তিনি।

বৃহস্পতিবার নাগোয়া সফরে গিয়ে জাপানের অটোমোবাইল উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোতোমাচি কারখানা এবং ‘টয়োটা মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি’ পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ ও জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে নতুন কাঠামো তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশটি বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর।

সামগ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে সরকারি পর্যায়ের ছয়টি সমঝোতা দলিল, বেসরকারি পর্যায়ের ১৭টি সমঝোতা স্মারক, ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং সম্ভাব্য বড় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ও সমঝোতাগুলোর বাস্তবায়ন এবং নির্ধারিত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিই হবে এই সফরের অর্থনৈতিক সাফল্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন