রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ডিসেম্বরে ফুরোচ্ছে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ, পানিবণ্টন নিয়ে নতুন শঙ্কা

নিউজ ডেস্ক

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে শুষ্ক মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায়।

দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের ৭২ বছর বয়সী বাসিন্দা বিকাশ সোরেনের স্মৃতিতে একসময় গঙ্গা নদীর প্রাণবন্ত রূপ ছিল। তিনি জানান, আগে ভারত থেকে আসা এই নদীতে সারা বছর বড় বড় নৌকা চলাচল করত। অথচ এখন বছরের প্রায় তিন মাস নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। গত মৌসুমে পানির অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ায় দুজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশে গঙ্গা নদী পদ্মা নামে পরিচিত। নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একসময় পদ্মা থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরতেন ৫৫ বছর বয়সী আবু বকর সিদ্দিক। এখন জীবিকার তাগিদে পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেছেন তিনি। তার প্রশ্ন, ‘এখন আমরা মাছ কোথায় পাব?’

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা নদী বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি প্রায় ৬৫ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে, যাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি বাংলাদেশি।

নতুন চুক্তির অপেক্ষা

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন করা হয়। আগামী ১২ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বাড়ানোর কোনো বিধান নেই।

পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও পানিবণ্টনবিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। এসব নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খানের অভিযোগ, ভারত উজানে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ করেছে। তার মতে, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরুর অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, নদীসংক্রান্ত যেকোনো বিষয় যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। কমিশনের কারিগরি পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত মে মাসে। তবে মন্ত্রী পর্যায়ের সর্বশেষ নিশ্চিত বৈঠক হয় ২০২২ সালে, দীর্ঘ ১২ বছর বিরতির পর।

এদিকে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির প্রস্তাবও ২০১১ সাল থেকে ঝুলে রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে যান। এরপর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। একই মাসে শেষ হচ্ছে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ। এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক ও পানিবণ্টন আলোচনা কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফারাক্কা বাঁধ থেকে দীর্ঘদিনের বিরোধ

গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিরোধের সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে। ওই বছর ভারত ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। বাংলাদেশের অভিযোগ ছিল, এ বাঁধের মাধ্যমে ভারত গঙ্গার পানির বড় অংশ সরিয়ে নিচ্ছে। পরে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৭৭ সালে দুই দেশ একটি পানিবণ্টন চুক্তিতে পৌঁছায়।

ঢাকাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকনের মতে, এক দশক পর ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে গঙ্গা অববাহিকায় ভয়াবহ পানিসংকট দেখা দেয়। তার দাবি, চুক্তি না থাকায় গঙ্গা নদী চরম সংকটে পড়ে এবং অন্তত তিনটি নদী প্রায় শুকিয়ে যায়।

এসব নদীর একটি গড়াই। সুন্দরবনে মিঠাপানি সরবরাহে নদীটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ত পানির আগ্রাসন বাড়ার প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় গড়াইয়ের মিঠাপানির প্রবাহ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শেখ রোকন জানান, পানির অভাবে দেশের সবচেয়ে বড় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পও একসময় প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল।

এই সংকট মোকাবিলায় গত মে মাসে ঢাকা ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

চুক্তি না হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

শেখ রোকন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি অতীতের চুক্তিহীন সময়ের চেয়েও খারাপ হতে পারে। কারণ, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশেই মিঠাপানির চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালের চুক্তির পরও গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতা ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে এর পরিণতি হবে বিপর্যয়কর।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে এ খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ কমে পানিসংকট বাড়ছে, অন্যদিকে বর্ষায় অতিবৃষ্টির কারণে বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি ও গ্রাম।

এ অবস্থায় গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা না গেলে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, সুন্দরবনের পরিবেশ এবং নদীনির্ভর জনপদের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন