বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন ব্লকচেইন প্রতিষ্ঠান ও সহযোগীদের সহায়তায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বাইন্যান্স।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রাথমিক তদন্তে তাদের একজন ডেভঅপস প্রকৌশলীর ল্যাপটপের নিরাপত্তা compromised হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই ল্যাপটপের মাধ্যমে হামলাকারী বাইন্যান্সের একটি অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং অননুমোদিতভাবে অর্থ উত্তোলনের লেনদেন সম্পন্ন করে। তবে কোনো ওয়ালেটের ব্যক্তিগত চাবি বা প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ঘটনার পরপরই বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুক্রবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতে বিটকয়েনের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে দাঁড়ায়।
বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দামও প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ ডলারে নেমে আসে। এর প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বিটকয়েন ধারণকারী প্রতিষ্ঠান মাইক্রোস্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে যৌথ উদ্যোগ
সাইবার হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ উদ্ধার ও অর্থের প্রবাহ আটকে দিতে বিভিন্ন ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ শুরু করেছে। বাইন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে জানিয়েছেন, হ্যাকিংয়ের কারণে হওয়া সব আর্থিক ক্ষতি প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব তহবিল ও সুরক্ষা তহবিল থেকে বহন করবে।
সম্পদ জব্দের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার ও সার্কেল। টেথার হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। অন্যদিকে, সার্কেল আটকে দিয়েছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ।
এ ছাড়া রিপল প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছেন বাইন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের সঙ্গে কাজ করে বিটগোও চুরি হওয়া সম্পদের একটি অংশ আটকে দিতে ভূমিকা রেখেছে।
বাইন্যান্সের হিসাবে, বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বাকি সম্পদ উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্লকচেইন বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে।
লেনদেন সাময়িক স্থগিত, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ থাকার দাবি
নিরাপত্তা যাচাই ও ঝুঁকি মোকাবিলায় বাইন্যান্স সাময়িকভাবে সব ধরনের জমা ও উত্তোলন কার্যক্রম স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ঠিকানাগুলোর অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে এবং অর্থের গতিবিধি শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যবহারকারীদের মূল তহবিল নিরাপদ রয়েছে এবং সাইবার হামলার কারণে গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতি হলে তা বাইন্যান্সই বহন করবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর জমা-উত্তোলন কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হবে।
এ ঘটনায় ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার সাইবার অপরাধীদের হামলার কৌশলকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে বড় আর্থিক প্ল্যাটফর্মগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, কর্মীদের ডিভাইস সুরক্ষা এবং লেনদেন যাচাইব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হলে হামলার কারণ, ক্ষয়ক্ষতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

