দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফ্রান্সজুড়ে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। রাজধানী প্যারিসে বড় ধরনের জাতীয় ধর্মঘটের প্রস্তুতির মধ্যে শনিবারের (৩১ অক্টোবর) বিক্ষোভ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজপথ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একই ধরনের অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে জার্মানি, ইতালি, আলবেনিয়া, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও। এসব আন্দোলনে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। নির্ধারিত পথে শান্তিপূর্ণ মিছিল শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল, পেট্রোল বোমা ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে।
এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এক জান্দার্মের দিকে পেট্রোল বোমা ছোড়া হলে তাঁর পায়ে গুরুতর অগ্নিদগ্ধের ক্ষত হয়। সংঘর্ষে মোট পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে ময়লার বিন ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন প্রায় ৭০ হাজার। তবে আন্দোলন আয়োজক তরুণ সংগঠনগুলোর দাবি, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ এবং প্যারিসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাত ৮টা পর্যন্ত দেশজুড়ে দাঙ্গা ও অরাজকতার অভিযোগে ৫০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হ্যালোউইন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা, ব্যাপক তল্লাশি
দুই সপ্তাহ আগে সংঘটিত সহিংসতা, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আগেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় ফরাসি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে শনিবার হ্যালোউইন উৎসব থাকায় মুখোশ ও ভীতিপ্রদ পোশাকের আড়ালে বিক্ষোভকারীরা যাতে পরিচয় গোপন করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক ছিল পুলিশ।
জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখা এবং ভুয়া অস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে আইনি বিধিনিষেধ কার্যকর রেখে শহরজুড়ে তল্লাশি চালানো হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, পুলিশ সারা দেশে প্রায় ৪০ হাজার তল্লাশি চালিয়েছে। এর মধ্যে শুধু প্যারিস অঞ্চল বা ইল-দ্য-ফ্রান্সে তল্লাশির সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার।
তবে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও মার্সেই শহরে একটি জুতার দোকানে চুরি ও লুটপাটের সময় পাঁচজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। লিও ও তুলুস শহরেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করতে হয় পুলিশকে।
আগামী সপ্তাহে শিক্ষার্থী অবরোধ ও জাতীয় ধর্মঘট
আন্দোলন আরও জোরালো করার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী ইউনিয়ন। মঙ্গলবার দেশটির দুটি বড় ছাত্র সংগঠন উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণাঙ্গ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
অন্যদিকে, মজুরি বৃদ্ধি, পেনশনব্যবস্থা রক্ষা এবং সরকারি বাজেটে ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন।
এদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে। কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউডের নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁ ও দলের শীর্ষ নেতারা প্যারিসের মিছিলে যোগ দেন। সমালোচকদের অভিযোগ, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তরুণদের অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন মেলঁশঁ।
অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
জার্মানিতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
ফ্রান্সের বাইরে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, হামবুর্গ, ব্রেমেন ও কোলনেও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভকারীরা একটি অস্ত্রের দোকানে ঢুকে অস্ত্র, জুতা ও পোশাক লুট করে। পরে পুলিশ দুই রাউন্ড অস্ত্র উদ্ধার করে।
বার্লিনের রোজেনথালের প্লাৎজ এলাকায় ময়লার বিন ও বৈদ্যুতিক স্কুটারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে অন্তত ২৭ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। কোলনে প্রায় ৫০ জন এবং বার্লিনে ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, স্পেনেও উত্তেজনা
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। এ সময় পুলিশের দিকে পাথর ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
স্পেনেও জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী অসন্তোষ বাড়ছে। শনিবার রাতে ‘ব্লোকুস’-এর বিক্ষোভ এবং সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিপুলসংখ্যক জাতীয় পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার কারণে শহরের কেন্দ্রস্থলের বেশ কয়েকটি দোকান তাদের কাচের সামনে কাঠের বা অন্য প্রতিরক্ষামূলক আবরণ স্থাপন করে।
গ্রান ভিয়া ও প্লাজা দে এস্পানাসহ মাদ্রিদের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যান, কর্মকর্তা ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা যায়।
গত মাসের শেষদিকে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় একটি চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, আবাসন সংকট নিরসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য এ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্রাসেলস ও লিসবনেও বিক্ষোভ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। কালো পোশাক পরা একদল আন্দোলনকারীকে নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যাপকভাবে টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত বাজেট বাড়ানোর দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের সামনে সমবেত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রতিবাদী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর সমর্থনে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়েও শত শত তরুণ এ কর্মসূচিতে যোগ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও রাজনৈতিক পরিবর্তন
পূর্ব ইউরোপের দেশ সার্বিয়াতেও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। রাজপথের বিক্ষোভের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জেন-জি তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিনের শাসকের ক্ষমতা হারানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন সংকট এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগের কারণে অসন্তোষ বাড়ছে। ফ্রান্সে আগামী সপ্তাহের ধর্মঘট ও শিক্ষার্থী অবরোধ কর্মসূচি আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। এতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

