রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

নিষিদ্ধ হওয়ার পরও ক্রিপ্টো লেনদেনে ১৩তম স্থানে বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার ও লেনদেন আইনগতভাবে অনুমোদিত নয়। এ বিষয়ে একাধিকবার সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতার মধ্যেও দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার থেমে নেই। বরং ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ক্রিপ্টো অ্যাডপশন ইনডেক্সে ১৫১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩তম।

আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনালাইসিসের প্রকাশিত ‘২০২৫ গ্লোবাল ক্রিপ্টো অ্যাডপশন ইনডেক্স’ অনুযায়ী, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়াতেও বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। বিশ্বে ক্রিপ্টো ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ভারত। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল ও নাইজেরিয়া।

তবে এই অবস্থান বাংলাদেশের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের আইনি স্বীকৃতি নির্দেশ করে না। সূচকটি মূলত বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টো সেবা ও লেনদেনে মানুষের অংশগ্রহণের মাত্রা পরিমাপ করে।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কেন বাড়ছে ব্যবহার?

চেইনালাইসিসের সূচকে কোনো দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ কি না, তা বিবেচনা করা হয় না। বরং খুচরা ব্যবহারকারী, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ক্রিপ্টো সেবা, বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থা (ডিফাই) এবং বড় প্রতিষ্ঠানের লেনদেনসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক কাজ, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং ডিজিটাল সম্পদের প্রতি তরুণদের আগ্রহ ক্রিপ্টো ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) লেনদেনব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে যুক্ত হচ্ছেন।

P2P লেনদেনে নির্ভরতা

বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিয়ার-টু-পিয়ার বা P2P ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে একজন ব্যবহারকারী স্থানীয় মুদ্রায় অন্য ব্যবহারকারীকে অর্থ পরিশোধ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে পারেন। পরে সেই ডিজিটাল সম্পদ অন্য ওয়ালেটে পাঠানো কিংবা বিক্রি করার সুযোগ থাকে।

তবে এ ধরনের লেনদেনে প্রতারণা, অর্থপাচার, পরিচয় গোপন করে অর্থ স্থানান্তর এবং দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্থ পাঠানোর ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের আইনি অবস্থান অনুমোদনমূলক না হওয়ায় ব্যবহারকারীদের জন্য এসব লেনদেনে বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ বিভিন্ন ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান অনুযায়ী, এসব মুদ্রা কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না এবং বাংলাদেশে বৈধ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃত নয়।

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবহারকারীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা। পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সির দামের ব্যাপক ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তরুণদের মধ্যে বাড়ছে আগ্রহ

বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ তরুণ। বাংলাদেশেও প্রযুক্তি, অনলাইন ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল সম্পদ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সীমান্তপারের অর্থ লেনদেন এবং স্টেবলকয়েন নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে এসব ব্যবহারের আইনি অবস্থান ও আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেক ব্যবহারকারী প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

এক বছরে ৩৫তম থেকে ১৩তম অবস্থানে বাংলাদেশ

চেইনালাইসিসের ২০২৪ সালের গ্লোবাল ক্রিপ্টো অ্যাডপশন ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩৫তম। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের সূচকে দেশটি উঠে আসে ১৩তম অবস্থানে। অর্থাৎ ওই সূচকে ক্রিপ্টো ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়।

তবে এই র‍্যাঙ্কিংকে দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈধতা পাওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি মূলত বিভিন্ন ক্রিপ্টো সেবায় মানুষের অংশগ্রহণ ও লেনদেনের মাত্রা তুলে ধরে।

২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম

২০২৬ সালের ‘চেইনালাইসিস জিওগ্রাফি অব ক্রিপ্টো’ প্রতিবেদনে নতুন পদ্ধতিতে দেশগুলোর ক্রিপ্টো অর্থনীতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম। ফলে ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশের ১৩তম অবস্থানকে বর্তমান র‍্যাঙ্কিং হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতার মধ্যেও এর ব্যবহার ও আগ্রহ রয়েছে—২০২৫ সালের চেইনালাইসিস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তার একটি আন্তর্জাতিক চিত্র তুলে ধরে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের নতুন সূচকে অবস্থানের পরিবর্তন দেখায়, ক্রিপ্টো ব্যবহারের পরিমাপ পদ্ধতি ও সময়ের সঙ্গে এ চিত্রও বদলে যেতে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন