বৃষ্টি, বাতাস ও ঋতু পরিবর্তন আল্লাহর ক্ষমতা ও রহমতের নিদর্শন। এসব প্রাকৃতিক পরিবর্তন কখনো স্বস্তি ও কল্যাণ বয়ে আনে, আবার কখনো মানুষের জন্য কষ্ট ও বিপদের কারণ হয়। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন। তিনি বাতাস ও বৃষ্টির কল্যাণ কামনার পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার দোয়া শিখিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি ও বাতাসের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি বাতাস পাঠান। তা মেঘমালা সৃষ্টি করে। এরপর তিনি ইচ্ছামতো আকাশে মেঘ ছড়িয়ে দেন কিংবা স্তূপ করে রাখেন। তখন তুমি দেখতে পাও, মেঘের ভেতর থেকে বৃষ্টি বেরিয়ে আসছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪৮)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষ নিরাশ হয়ে পড়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ২৮)
অতিরিক্ত বাতাস ও বৈরী আবহাওয়া কখনো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ কারণে বাতাসকে গালমন্দ না করে এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে এবং কল্যাণ কামনা করতে বলেছেন মহানবী (সা.)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, বাতাস আল্লাহর রহমতের নিদর্শন। কখনো তা রহমত নিয়ে আসে, আবার কখনো শাস্তির কারণ হয়। তাই বাতাসের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে এবং এর কল্যাণ কামনা করতে হবে। (সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহ)
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় নবীজি (সা.)-এর আচরণ
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আকাশে মেঘ জমতে দেখলে মহানবী (সা.)-এর চেহারার রং বদলে যেত। তিনি ঘরের ভেতরে যেতেন, আবার বাইরে আসতেন। বৃষ্টি শুরু হলে তিনি স্বস্তি অনুভব করতেন।
এর কারণ জানতে চাইলে তিনি আদ জাতির কথা উল্লেখ করেন। তারা আকাশে মেঘ দেখে বৃষ্টির আশা করেছিল। পবিত্র কোরআনে তাদের সেই ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘যখন তারা মেঘকে তাদের উপত্যকার দিকে আসতে দেখল, তখন বলল, এটি তো আমাদের বৃষ্টি দেবে।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত: ২৪)
কিন্তু তাদের কাছে রহমত মনে হওয়া সেই মেঘ ছিল ধ্বংসাত্মক ঝড়ের পূর্বাভাস। (সহিহ মুসলিম)
বাতাস, বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় পড়ার জন্য মহানবী (সা.) কয়েকটি দোয়া শিখিয়েছেন।
১. বাতাসের কল্যাণ কামনার দোয়া
প্রবল বাতাস প্রবাহিত হলে মহানবী (সা.) এই দোয়া পড়তেন—
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা ফিহা ওয়া খাইরা মা উরসিলাত বিহি, ওয়া আউজু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা ফিহা ওয়া শাররি মা উরসিলাত বিহি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এই বাতাসের কল্যাণ, এর মধ্যে থাকা কল্যাণ এবং যে কল্যাণের জন্য একে পাঠানো হয়েছে, তা কামনা করছি। আর এর অনিষ্ট, এর মধ্যে থাকা অনিষ্ট এবং যে অনিষ্টের জন্য একে পাঠানো হয়েছে, তা থেকে আপনার আশ্রয় চাই। (সহিহ মুসলিম)
২. আকাশে মেঘ জমলে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার দোয়া
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) আকাশে মেঘ জমতে দেখলে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। তিনি বলতেন—
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا أُرْسِلَ بِهِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাঊজু বিকা মিন শাররি মা উরসিলা বিহি।
অর্থ: হে আল্লাহ, যে জিনিস দিয়ে মেঘ পাঠানো হয়েছে, তার অনিষ্ট থেকে আমরা আপনার আশ্রয় চাই। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
মেঘ থেকে যেমন বৃষ্টি হতে পারে, তেমনি তা আসন্ন ঝড়েরও সংকেত হতে পারে। এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অনুকূল আবহাওয়ার আশা করার পাশাপাশি সম্ভাব্য বিপদ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
৩. বৃষ্টি কামনার দোয়া
খরার সময় এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বলেন। তখন নবীজি (সা.) জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি দুই হাত তুলে দোয়া করেন—
আরবি:
اللَّهُمَّ أَغِثْنَا، اللَّهُمَّ أَغِثْنَا، اللَّهُمَّ أَغِثْنَا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আগিসনা, আল্লাহুম্মা আগিসনা, আল্লাহুম্মা আগিসনা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের বৃষ্টি দিয়ে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ, আমাদের বৃষ্টি দিয়ে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ, আমাদের বৃষ্টি দিয়ে সাহায্য করুন। (সহিহ বুখারি)
৪. উপকারী বৃষ্টির জন্য দোয়া
বৃষ্টি শুরু হলে মহানবী (সা.) বলতেন—
আরবি:
اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিআন।
অর্থ: হে আল্লাহ, এই বৃষ্টিকে উপকারী করুন। (সহিহ বুখারি)
বৃষ্টি মানুষের জীবনধারণ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শুষ্ক আবহাওয়ায় বৃষ্টি স্বস্তি নিয়ে আসে। এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এমন বৃষ্টি কামনা করা হয়, যা প্রকৃতিকে সজীব করে এবং মানুষের উপকারে আসে।
৫. অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পড়ার দোয়া
অতিরিক্ত বৃষ্টি কখনো মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রবল বৃষ্টিতে কষ্টকর পরিস্থিতি তৈরি হলে মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন—
আরবি:
اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়। (সহিহ বুখারি)
বৃষ্টি ও বাতাস আল্লাহর নিয়ামত। তাই আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও কল্যাণ কামনা করা মুমিনের করণীয়। মহানবী (সা.)-এর শেখানো এসব দোয়া সেই শিক্ষাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

